রংপুরের বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির ও অনিয়মের জন্য শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে অভিযুক্ত করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তার এমন বক্তব্যের পর পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে দীপু মনির প্রতি নিজের নানা ক্ষোভ প্রকাশ করেন কলিমউল্লাহ।
তার বক্তব্যের পাল্টা জবাবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় বলেছে, নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিয়েছেন। এদিকে কলিম উল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারে পাওয়া বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পায় ইউজিসির তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় ইউজিসি। সেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ভিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়।
এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করেন নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ।
তিনি বলেন, ইউজিসির যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে এটা বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও উপমন্ত্রীর (মহিবুল হাসান চৌধুরী) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে করা হয়েছে।
কলিমউল্লাহ বলেন, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি যে আসনে নির্বাচন করে সেই আসনে আমার নানা ও মামা প্রতিনিধিত্ব করেন। এটা চাঁদপুরের স্থানীয় রাজনৈতিক কারণে হতে পারে।
কী কারণে শিক্ষামন্ত্রী ইউজিসির প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করলেন, এ প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘হয়তো তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করেন। এ ছাড়া চাঁদপুরের স্থানীয় রাজনীতির কারণে করতে পারেন।
অধ্যাপক কলিমউল্লাহ বলেন, ইউজিসির প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অবস্থান করে এ ধরনের মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটা বক্সের টিক চিহ্ন দেয়ার মতো। তদন্তের প্রয়োজনে যেতে হবে, যাওয়া হয়েছে নাকি টিক দেয়ার জন্য গিয়ে টিক দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিনিধি সঠিকভাবে তদন্ত করতে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদন কমিটি যেসব তথ্য চেয়েছে, আমরা সেসব দিয়েছি। পরে প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বিভিন্ন সময় ইউজিসিতে গিয়ে এ প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করেছে।
‘শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির নির্দেশনায় এ ধরনের অবাঞ্ছিত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ইউজিসির প্রতিবেদন আমরা প্রত্যাখ্যান করি। এ প্রতিবেদনের দায় অবশ্যই ইউজিসিকে নিতে হবে। ইউজিসি এ দায় এড়াতে পারে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আজকে যে দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি, আমি দায়িত্ব নিয়েই বলবো এই পুরো পরিস্থিতিটা আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আশকারায় হয়েছে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তার সঙ্গে দেখা করতে যায় সময় নির্ধারণ করে, মন্ত্রণালয়ে তার অফিসে সকাল ১০টায় থাকলে তিনি হাজির হন বিকাল ৪টায়। আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পুরোটা দিন তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কখনও হয়নি এবং এই জাতীয় যে মনোভাব এটি বহিঃপ্রকাশ হয়েছে তখনই।
তিনি বলেন, যতবার আমরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তার কাছে যেতে চেয়েছি, ক্রোড়পত্রের জন্য বাণী চেয়েছি, একটিবারও তার কাছে কোনও আশীর্বাদ পাইনি। আমাদের মাননীয় উপমন্ত্রী খুবই সৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। যতবার তার কাছে গিয়েছি তার কাছে বাণী পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পেয়েছি কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর কাছেই অবজ্ঞাটা লাভ করেছি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য: নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণ গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রনালয়।
এতে বলা হয়, শিক্ষামন্ত্রীকে দোষারোপ করে ভিসি কলিম উল্লাহ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এতে বলা হয়, ইউজিসি তাদের নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণে তদন্ত করে মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠায়। ইউজিসি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এ প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে নানা ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বরাবর তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
কলিমউল্লাহ সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য রেখেছেন যা নিতান্তই অনভিপ্রেত দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে যে সভাটিতে মন্ত্রীর দেরিতে উপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন সে সভাটি গত ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সকালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পরে সভাটির সময় পরিবর্তন করে বিকেলে নেয়া হয়।
এতে বলা হয়, ওই একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের অভিন্ন ন্যূনতম নির্দেশিকা প্রণয়নসংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সভা থাকায় এবং সে সভাটি উপাচার্যদের সঙ্গে আলোচনার আগে হলে ভালো হয় বিবেচিত হওয়ায় উপাচার্যদের সঙ্গে সভাটির সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল।
