৬ ও ৭ মার্চ, সুনিল গাভাস্কার, ৩৪ এবং আহমেদাবাদের মোতেরা। কী অদ্ভুত মিল, যেন সব বিষয়গুলো এক সুতোয় গাঁথা। ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ উইন্ডিজে অভিষেক হয়েছিল ভারত কিংবদন্তি সুনিল গাভাস্কারের। গতকাল ছিল ৬ মার্চ, তার টেস্ট অভিষেকের ৫০ বছর। আবার ৭ মার্চ, অভিষেকের ১৬ বছর পর প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ১০ হাজার রানের রেকর্ড গড়েন তিনি। আজ সেই ৭ মার্চ। ১৯৮৭ সালের এই দিনে আহমেদাবাদের মোতেরা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০ হাজার ছুঁয়েছিলেন। ১৯৮৭ থেকে ২০২১, ৩৪ বছর, গাভাস্কারের সেঞ্চুরির সংখ্যাও ৩৪টি। সেই মোতেরা (এখন নরেন্দ্র মোদি) স্টেডিয়ামে চলছে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট। নিজের অভিষেকের ৫০ বছর পূর্তির দিনে মাঠে ধারাভাষ্যকার হিসেবে ছিলেন ভারত কিংবদন্তি। ৭১ বছর বয়সেও ক্রিকেট ফেরিওয়ালা গাভাস্কার ১০ হাজারের মাইলফলক ছোঁয়ার মাঠেই কাটালেন ক্রিকেটের ৫০ বছর।
দারুণ এ উপলক্ষের দিনটিকে বিনা আয়োজনে যেতে দেয়নি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। টেস্টের তৃতীয় দিন লাঞ্চের সময় ছোট্ট আয়োজন। সেখানে ‘৫০ বছর উদযাপন’ লেখা একটি স্মরণিকা ক্যাপ উপহার দেওয়া হয় গাভাস্কারকে। বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি অসুস্থতা থেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায়। তাই সেক্রেটারি জয় শাহ কাচ দিয়ে ঘেরা ট্রফির মতো করে বাঁধানো ক্যাপটি তুলে দেন ‘লিটল মাস্টার’ খ্যাত গাভাস্কারের হাতে। এ সময় মাঠে আসা দর্শকদের অভিনন্দনের জবাব দেন গাভাস্কার। মাথায় থাকা বিলেতি ক্যাপ খুলে কুর্নিশ করেন দর্শকদের উদ্দেশে। পরে ধারাভাষ্য কক্ষে কেক কেটে তার ক্রিকেট ‘গোল্ডেন জুবিলি’ উদযাপন করেন।
টেলিভিশনে আয়োজনের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো যখন চলছে ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে দারুণ তথ্য জানালেন। একসঙ্গে ধারাভাষ্য করার কোনো এক সময় পাশে থাকা গাভাস্কারের কাছে জানতে চান– ৩৪টি সেঞ্চুরির রেকর্ড কারও পক্ষে ভাঙা সম্ভব কি না। কিংবা ১০ হাজার রানের রেকর্ডটিও আজীবন টিকবে কি না। গাভাস্কার বলেন– ১০ হাজার রানের রেকর্ডটি হয়তো টিকবে না কিন্তু টেস্টে ৩৪টি সেঞ্চুরি কেউ করবে তা মনে করেন না। কিন্তু গাভাস্কার পরে ভুল প্রমাণিত হন। তাকে আদর্শ মেনে বেড়ে ওঠা আরেক মুম্বাইকার শচিন টেন্ডুলকার ছাড়িয়ে যান তাকে। ১০ হাজার রানের মাইলফলক টপকেছেন ১৩ জন। গাভাস্কার নিজেই সেই তালিকায় ১২তম স্থানে নেমে গেছেন।
সেঞ্চুরির রেকর্ড হয়তো একার নেই গাভাস্কারের, কিন্তু অভিষেক সিরিজে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডে তাকে কেউ টপকাতে পারেনি। ১৯৭২ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে ৭৭৪ করেছিলেন, যে রেকর্ড অটুট ৫০ বছর ধরে। এমন অনেক প্রথমেই গাভাস্কারের নাম আছে। প্রথম হিসেবে এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েছেন তিনবার। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন রিকি পন্টিং ও ডেভিড ওয়ার্নার। প্রথম ভারতীয় হিসেবে (নন উইকেটরক্ষক) শততম ক্যাচ নিয়েছেন। প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইনিংসের আদ্যন্ত ব্যাট করেছেন ১৯৮৩ সালে ফয়সালাবাদ টেস্টে। এছাড়া ১৮ ভিন্ন ব্যাটসম্যানের সঙ্গে সেঞ্চুরির জুটি গড়া একমাত্র ক্রিকেটার তিনি। আর দুটি স্টেডিয়ামে (পোর্ট অব স্পেন ও মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে) টানা চারটি সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটসম্যানও গাভাস্কার।
গাভাস্কারের মাইলফলকের দিনে শুভেচ্ছা বার্তায় ভরে উঠেছে টুইটার, ফেইসবুক। শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি তাকে আইডল মানা শচিন টেন্ডুলকার। শচিন লিখেন, ‘৫০ বছর আগে এই দিনে তিনি ক্রিকেট বিশ্বে ঝড় হয়ে এসেছিলেন। তিনি অভিষেক সিরিজেই ৭৭৪ রান করেন এবং তার মধ্যে একজন তারকাকে দেখেই আমরা বড় হয়েছি। ভারত উইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতল সেই সঙ্গে ভারতে ক্রিকেটের নতুন ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে গেল। ওই সময় একজন কিশোর হিসেবে আমি বুঝলাম একজন এমন পেয়েছি যাকে দেখে এবং অনুসরণ করে আমি এগিয়ে যাব। আর সেটা কখনই পরিবর্তন হয়নি, গাভাস্কারই আমার হিরো আছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার ৫০ বছর শুভ হোক। ১৯৭২ সালের ওই দলের সবাইকেই জানাই শুভ ৫০ বছর। আপনারা সবাই আমাদের গর্বিত করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন।’
এদিন বিশেষ ক্যাপ পেয়ে অতীতে ফিরে গেলেন গাভাস্কার। বিসিসিআই ও ভক্ত সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘পরিচিতি দেওয়ার জন্য বিসিসিআইকে ধন্যবাদ। এত সুন্দর উপহারের জন্যও। বিসিসিআই ও ভক্তদের উৎসাহই আমাকে এতদূর এনেছে। আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ তারকাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। আমাদের সময় সেই সুবিধা ছিল না। তাই আমার ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে উৎসাহ দিত সমর্থকরা। দেশের অগণিত ক্রিকেটপ্রেমীদের অবদান ভুলতে পারব না। জাতীয় দলের নীল রঙের টুপি হাতে নেওয়ার পর অতীতের দিনগুলো মনে পড়ছিল। সত্যি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।’
