আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। সুবর্ণজয়ন্তী সাতই মার্চেরও। ঐতিহাসিক সাতই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। অনেকেই বলেন এটি ছিল সমুদ্রের ঢেউ ও গর্জনের মতো। মানুষের উপস্থিতি ছিল উপচেপড়া ঢেউয়ের মতো। সেদিন মানুষের এত ভিড় ছিল যে, সেটা বোঝাতেই এটা বলা হয়ে থাকে। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’। বঙ্গবন্ধু ভাষণটি শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথাটি বলে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শুরু এবং শেষের এই বাক্যগুলো যদি আমরা ব্যাখ্যা করি, তাহলে স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীর মাসে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারব, আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সাধারণভাবে যেটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি সেটির সঙ্গে যদি এখনকার বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তাহলে বুঝতে পারব আমরা সেই লক্ষ্য কতটা অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হিসেবে কতটা আমরা অর্জন করতে পেরেছি।
প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশের সংবিধানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় রচিত হয়েছিল। স্বপ্ন ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক চেতনায় একটি সাম্যবাদী দেশ প্রতিষ্ঠা করা। একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, যেখানে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা রাজনীতির কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। আবার বৈষম্যের ক্ষেত্রে সম্পদের বা উপার্জনের কোনো বৈষম্য থাকবে না। কারণ, আমরা জানি, পাকিস্তান আমলে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তখন এই ভূখন্ডের মানুষ সংগ্রাম করেছে। আমরা এখন নানাভাবে দেখি যে, দেশ এগিয়েছে, বিশে^র নানা জরিপ ও ফলাফলে দেশের অগ্রযাত্রার কথা বলা হচ্ছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা হিসাবটা মিলিয়ে দেখতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অনুপ্রেরণায় যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ, লিঙ্গভেদে কোনো নাগরিকের প্রতি কোনো বৈষম্য করা হবে না সেটা কতটা অর্জিত হলো?
নারীরা এখন অনেক এগিয়েছে। একটা সময় ছিল নারীরা অল্প শিক্ষিত হোক বা উচ্চ শিক্ষিত হোক একটা সময়ে উভয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। কিন্তু একাত্তরের পর থেকে হিসাব নিলে দেখব, অনেকগুলো ক্ষেত্রেই এগিয়েছে নারীরা। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়ু, কর্মসংস্থান নানা কিছুই বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চলাফেরার কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন নারীরা। নারী এখন বিদেশে যেতে পারছেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারছেন। কৃষিতে তো অবদান রাখছেনই। এমনকি উদ্যোক্তা হয়েও নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করছেন নারীরা।
আমরা যদি পেছনে ফিরে তাকাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই নারীরা কী ধরনের অবদান রেখেছেন? নারীরা একাত্তরে নানা ধরনের অত্যাচার, নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, তখন স্রোতের মতো লোকজনকে গ্রামে ফিরে যেতে হয়েছে। তখন নারীরা সবাইকে আশ্রয় দিয়েছেন। আবার গেরিলারা যখন যুদ্ধের জন্য দেশের নানা জায়গায় গিয়েছেন, সারা দেশের নারীরাই তাদের খাবার জুগিয়েছেন, পাশে থেকে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। আবার যুদ্ধশিশুর মা হিসেবে নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন।
এখন স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে একটু হিসাব করে দেখতে চাই বাংলাদেশের নারীরা কতদূর এগিয়েছেন? সেসব এখন বিচার করতে হবে।
এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে কভিড-উত্তর পৃথিবীতে সমতার বিশ^ গড়ে তোলার জন্য নারী নেতৃত্ব। কমনওয়েলথ ঘোষণা করেছে তাদের সদস্যভুক্ত ৩টি দেশ, যাদের নারী নেতৃত্ব করোনা মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে। সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এছাড়া আমাদের সংসদের স্পিকার নারী, বিরোধী দলের নেতা নারী। জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যও সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী। তবে সংখ্যাটা কম। আবার অনেক জায়গাতেই নারীরা সমান অধিকার পান না। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে সমান অধিকার পান না।
নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ধরা যাক, রাতের কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে নারী যদি যৌন হেনস্তার শিকার হন, তবে প্রথম অভিযোগের তীরটা নারীর দিকে আসে। নারী হয়ে এত রাতে অনুষ্ঠানে গেল কেন? এমন প্রশ্নের মুখে কেন পড়তে হবে নারীদের? এই বাংলাদেশ যেমন পুরুষের, তেমনি নারীরও। তবে কেন নারীদের এসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। তবে কি এ দেশটা শুধুই পুরুষদের? নারীদের নয়? এসব প্রশ্ন যখন সামনে আসে, তখন মনে হয়, আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। নারীরা আসলেই কতদূর এগিয়েছেন, তা ভেবে দেখতে হবে।
এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। নারীর অধিকার প্রশ্নে তাদের আরও কার্যকর কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। প্রশাসন যারা পরিচালনা করেন, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায় নারীদের নিয়ে নানারকম কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নারীবিদ্বেষ ছড়ানোদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আফগানিস্তানে সম্প্রতি কজন নারী সাংবাদিক ও চিকিৎসককে হত্যা করা হয়েছে। এর জন্য মৌলবাদীদের দিকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সারা বিশ্বেই নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার প্রশ্নে যথাযথ উদ্যোগের অভাব দেখা যায়। আমাদের দেশেও এরা সক্রিয়। এগুলো প্রতিরোধে ও বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেসব বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতীয় বাজেটে জেন্ডার ইকুয়্যালিটির জন্য যে বাজেট বরাদ্দ করা হয় সেগুলো সমানভাবে নিয়ম মেনে পালন করা হয় কি না, সেসব দিকে আমাদের জনপ্রিতিনিধি থেকে শুরু করে আইনপ্রণেতাদের সজাগ থাকতে হবে। বাজেটের বরাদ্দ থেকে কতটুকু অংশ সঠিকভাবে নারীর উন্নয়নে বা নারীর কাজে ব্যয় হয়েছে, এমন কোনো মূল্যায়ন রিপোর্ট কিন্তু আমরা দেখি না।
নারীরা আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগ। এই ৫০ ভাগ নারীকে পিছিয়ে রেখে, তাদের অধিকার বা সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। আমরা যদি এভাবে এগিয়ে যাই, তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে আদর্শ রাষ্ট্রের কথা আমরা বলি, সেটি আমরা কখনো পাব না।
সিভিল সোসাইটি থেকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সচেতন হতে হবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে। নারীসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশে আরও যতœবান হতে হবে এবং আরও যাচাই-বাছাই করতে হবে। সম্প্রতি এক ক্রিকেটারের বিয়ে নিয়েও সবাই কিন্তু নারীটির দিকেই অভিযোগের তীর তাক করেছে। এসব ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ দিতে হবে।
আমাদের সংস্কৃতি কতটা নারীবান্ধব সেটাও বিবেচনা করতে হবে। কারণ আমাদের ভাষার মধ্যেই এমন অনেক শব্দ, এমন অনেক প্রবাদ-প্রবচন আর কথা চালু আছে যা কিনা নারীর স্বাভাবিক বিকাশের প্রতিকূল। ধরুন আমরা বলি ‘কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা’। নারীকে দায় বা বোঝা হিসেবে দেখা হয় সব জায়গাতেই। এই সংস্কৃতি ও মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এর বদলে নারীবান্ধব সংস্কৃতি নির্মাণের দিকে মনোযোগী হতে হবে।
আবার ওয়াজ বা ধর্মীয় বক্তব্যের নামে খোলা মঞ্চে যেভাবে নারীবিদ্বেষী কথা বলা হয়, নারীর সমঅধিকারের বিরুদ্ধে কথা বলা হয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অথচ দেখা যায়, সরকার তাদের ব্যাপারে নীরব থাকে। বিপরীতে যারা মুক্তমত চর্চা করছেন, তাদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সম্প্রতি আমরা একটু আশান্বিত হয়েছি যে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিচার বিভাগ একটি রায় দিয়েছে। সেখানে বিবাহিত নারী তার স্বামীর ‘সম্পদ’ নয় বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, স্ত্রী স্বামীর ক্রীতদাসী নয়। এই বিষয়টা আমাদের সবার মনে রাখতে হবে। এসব বিষয়ে আমাদের গণমাধ্যমগুলো যাতে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করে ও সবাই যাতে নারীর প্রতি আরও সহনশীল ও সমঅধিকারের প্রশ্নে একমত হয় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমি এই আশাই করি। তাহলেই আমরা আমাদের একাত্তরের যুদ্ধশিশুদের, একাত্তরের সম্ভ্রম হারানো নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারব। একইভাবে আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিও শ্রদ্ধা জানাতে পারব। কারণ, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত দেশ, সাম্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দেশ। তাই যারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদেরও উচিত এসব বিষয় মেনে চলা।
লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ
