করোনাকালে বইমেলা ও বিধিনিষেধ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১০:২৩ পিএম

ব্যক্তিগত মতামত দিয়ে কোনো লেখা শুরু না করাই ভালো। তবু বলে রাখি যে, আমি এই করোনাকালে বইমেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে ছিলাম। আমি আপত্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের লেখক-কবি-প্রকাশকদের একটি বিরাট অংশ আমার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন দেশে সব যখন খোলা আছে তাহলে বইমেলা চলতে অসুবিধা কোথায়? উত্তরে বলেছিলাম সবাই ভুল করলে আমাকেও যে ভুলপথেই যেতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি? আর সরকার যে দেশে সবকিছু খুলে দিয়ে রেখেছে, আমি তো তার বিরোধিতা করেই চলেছি। তাহলে বইমেলার মতো বিষয়ে আপত্তি জানানোর অধিকার আমার পুরোমাত্রায় আছে।

দেখাই তো যাচ্ছে, আমার বা আমার মতো কয়েকজনের আপত্তি ধোপে টেকেনি।

এখন একটু জানা দরকার মনে করছি, বইমেলা হবে কি হবে না এই সিদ্ধান্ত কারা গ্রহণ করেন? এককথায় বইমেলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কাদের কাদের মতামত নেওয়া হয়? দৃশ্যত তিনটি প্রতিষ্ঠান। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি এবং প্রকাশকদের সমিতি। ব্যস হয়ে গেল। যারা বই লেখেন, সেই লেখকদের মতামত নেওয়া বা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলা একাডেমির কমিটিতে একজন বা দুইজন লেখক-কবি থাকেন বটে, তবে তারা নির্বাচিত নন, মনোনীত। অনেকটা অলংকারস্বরূপ। আমলা-ব্যবসায়ী পরিবেষ্টিত সভাগুলোতে তারা জোরের সঙ্গে কোনো মতামত তুলে ধরতে পারেন কি না সন্দেহ। কারণ এমন লোকদেরই সেখানে বেছে নেওয়া হয় যারা সরকার-আমলা বা প্রকাশকদের অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো সত্যি কথা উচ্চারণ করবেন না। বাংলা একাডেমির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই ধরনের ‘মনোনীত’ লোকদের নিয়ে কার্যনির্বাহী পরিষদ চালানোর কথা নয়। প্রত্যক্ষ ভোটের কথা বলা আছে। সাধারণ ও জীবন সদস্যদের মধ্য থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসবেন চারজন। আর ফেলোদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন দুজন। আমার লেখালেখির জীবনের শৈশবে একটি নির্বাচনের খবর শুনেছিলাম। সেখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন লেখক-কবিরাই। নির্বাচিত হয়ে আসা সদস্যদের বুকে এবং মনে জোর থাকে বেশি। মনোনীত সদস্য ভয়ে ভয়ে থাকেন। জোরের সঙ্গে কোনো কথা বলতে গেলে তাকে আবার বাদ দিয়ে দেওয়া হতে পারে। নির্বাচিত সদস্যের সেই ভয় থাকে না। তাই নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে ভয় বাংলা একাডেমির শীর্ষপদে আসীনদের। সেই কারণেই হয়তো প্রত্যেক বছর বার্ষিক সাধারণ সভায় নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও গত কুড়ি বছরে একটাও নির্বাচন হয়নি বাংলা একাডেমির। ফলাফল হচ্ছে যারা একাডেমি, দেশ, জাতি, বইমেলার মননের প্রতীক বলে চিহ্নিত, সেই লেখক-কবিদের ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই বাংলা একাডেমির কাজে-কামে, বইমেলার সিদ্ধান্তে।

অবশেষে দফায় দফায় দেন-দরবার ও বৈঠকের পর ফেব্রুয়ারির বইমেলা শুরু হলো মার্চ মাসে। মূলত প্রকাশক সমিতির নেতাদের চাপেই। তাদের যুক্তি বরাবরের মতো গতানুগতিক। সরকারও গতানুগতিকতাকেই ভালোবাসে।

বিভিন্ন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছি জাতীয় প্রতিকূলতার সময়েও বইমেলা করতে তাদের এত আগ্রহের কারণ কী? বলেছি, দেশের সব জায়গার মতো ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই বইমেলার আসল প্রাণ। তারা ঢাকার বাইরে। তাহলে বইমেলা জমে উঠবে, এমনটি আশা করেন কীভাবে? বলেছি, এই যে স্টলগুলোতে পার্টটাইম বিক্রেতা হিসেবে ছেলেমেয়েরা কাজ করে, এরা তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। এই পরিশীলিত লোকবল আপনারা এখন পাবেন কোথায়? করোনায় দেশে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি চলে গেছে লাখ লাখ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত। বইয়ের ক্রেতা তো তারাই। তারা এবার বইমেলায় বই কিনতে পারবেন না। আগে ১০০ টাকার বই কিনলে এবার ১০ টাকার বেশি খরচ করতে পারবেন না। আপনারা তো নির্ঘাৎ লোকসান গুনবেন।

তারা এসব কথার উত্তর দেননি।

পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, প্রকাশকদের একটি বড় অংশ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন সরকারের বই কেনার দিকে। তো সরকার যে তাদের বই কিনবেই এমন নিশ্চয়তা কোথায়? নিশ্চয়তা আছে। কারণ তারা মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শত শত বই বের করেছেন।

দ্বিতীয় কারণ, তারা অনেক নবীন লেখক-কবিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের বই বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নবীন বলতে বয়সে নবীন নয়। পক্বকেশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও আছেন। প্রকাশকরা তাদের আদর করে ডাকেন ‘মুরগি লেখক’। বইমেলায় একমাসে যে পাঁচ হাজার বই প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে চার হাজার আটশোটি এই ধরনের লেখকের বই। সেই টাকা তো তারা নিয়ে ফেলেছেন। ফেরত দেবেন না কোনো অবস্থাতেই। অতএব মেলা হতেই হবে।

এই রকম পরিস্থিতিতে শুরু হলো বইমেলা। প্রথম দিনেই বিপত্তি। লিটল ম্যাগাজিনের জায়গাতে বসানো হয়েছে খাবারের দোকান। আর লিটল ম্যাগাজিন কর্নারকে ঠেলে পাঠানো হয়েছে শেষপ্রান্তে অন্ধকার এক কোণে। সবাই জানেন, গুণে-মানে যেমনই হোক, লিটল ম্যাগাজিনের তুর্কিরা বইমেলাকে প্রাণবন্ত করে রাখেন পুরোমাস। ধর্মীয় স্থানে হাজিরা দেওয়ার মতোই তারা প্রতিদিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময় দেন মেলায় নিজ নিজ স্টলে। নিজেদের মধ্যে আড্ডা চলে, মতবিনিময় চলে, নতুন পরিকল্পনা তৈরি হয়, প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়। তদুপরি নতুন লেখক তৈরি ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য লিটল ম্যাগের গুরুত্ব সারা বিশ্বে স্বীকৃত। এখনকার ফেইসবুক-কণ্টকিত সাহিত্যের যুগেও লিটল ম্যাগ গুরুত্ব হারায়নি। জানা গেল, বইমেলার ডিজাইন করার সময় বাংলা একাডেমি নাকি লিটল ম্যাগাজিন কর্নারের কোনো অপশনই রাখেনি। ভাবা যায়! যেখানে পশ্চিমবঙ্গে বইমেলাতে লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বিশাল জায়গা বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি বইমেলা শুরুর আগে সাতদিনের লিটল ম্যাগ মেলার আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য একাডেমি, সেখানে বাংলা একাডেমির বইমেলার ডিজাইনেই লিটল ম্যাগাজিন নেই! অথচ মেলার মাঠে খাওয়ার দোকান প্রাধান্য পায়। তা নিয়ে হইচই হয়েছে। বইমেলার মাঠেই প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে। হওয়ারই কথা। শেষ পর্যন্ত আগের জায়গাতে লিটল ম্যাগাজিন ফিরেছে মেলা শুরুর সাতদিন পরে। তবে বাংলা একাডেমির ছিন্নভিন্ন ভাবমূর্তিতে আরও একটি কালো দাগ লেগে গেছে ততদিনে।

সম্প্রতি যা ঘটছে তা কারও কারও কাছে বিপুল হাসির খোরাক হয়ে গেছে। করোনার জন্য লকডাউন ঘোষিত হয়েছে দেশে। গাড়ি-ঘোড়া চলবে না। অফিস-আদালত, কলকারখানা চলবে। ভাবা যায়! মানুষ কীভাবে অফিসে যাবে, কারখানায় যাবে, সে দায়িত্ব মানুষের। সরকারের তা ভাবার সময় নেই। দরকার মনেই করেনি। সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা একাডেমি চালু রেখেছে বইমেলা। সময় বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা। বাস চলে না, মিনিবাস চলে না, লেগুনা চলে না, মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং বন্ধ। তাহলে মানুষ কীভাবে বইমেলাতে যাবে? পাঠক না হয় না গেল, প্রকাশকদের স্টলের কর্মচারীদের তো যেতেই হবে। তারা কীভাবে যাবে? পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেকথা ভাবার দায়িত্ব বাংলা একাডেমির নয়। কোনো প্রকাশক যে স্টল বন্ধ রাখবে তারও উপায় নেই। তাহলে শাস্তি হিসেবে আগামী বছর মেলায় তার প্রকাশনীর জন্য স্টল বরাদ্দে নিষেধাজ্ঞা নেমে আসবে খাঁড়া হয়ে।

প্রকাশকরা, বিশেষ করে, ছোট কিন্তু কমিটেড প্রকাশকরা পড়ে গেছেন মাইনকা চিপায়। জানি না কীভাবে তারা এই উভয় সংকট পাড়ি দেবেন।

লকডাউনের মধ্যেও এভাবে বইমেলা চালিয়ে যাওয়ার ধনুর্ভঙ্গ পণ কেন বাংলা একাডেমির? মহৎ কোনো উদ্দেশ্য কি আছে? সেটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তবে আমাদের ছোটলোকি চোখে একটি কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। সেটি অর্থনৈতিক। বইমেলার এক মাসে বাংলা একাডেমির সব কর্মচারী অনেক মোটা অঙ্কের বোনাস পেয়ে থাকেন। মাস না পেরুলে বোনাসের টাকা নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। কাটাকাটির হিসাব-নিকাশ বিরক্তিকর। তাই আগামী মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত মেলাটা টেনে নিয়ে যেতেই হবে তাদের। 

এই পর্যায়ে এসে আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই বাংলা একাডেমির কাজ বইমেলা করা নয়। কিন্তু এখন সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান কাজ। এতে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই বাংলা একাডেমির উচিত বইমেলা নামের এই জগদ্দল নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলা। প্রকাশকদের সমিতিই সারা পৃথিবীতে বইমেলার আয়োজন করে। এই দেশেও তারাই করুক। বাংলা একাডেমি যদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বছরে ছয়টি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে, তাহলেও জাতির সামনে চিন্তার নতুন দুয়ার খুলে যাওয়ার সুযোগ থাকে। যদি বছরে দুদিনের জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে, সেটিও কিছুটা জলসিঞ্চনের ব্যবস্থা করতে পারবে আমাদের সাহিত্যের পলিজমা খালটিতে।

সবশেষে আবার অনুরোধ, বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের ভোটের আয়োজন করে গণতান্ত্রিক বাংলা একাডেমি তৈরির একটা সুযোগ দেশের সারস্বত সমাজকে দিন।

লেখক কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত