গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার বাসা থেকে ব্যবসায়ী হাসান আলীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারের করা মামলা নেয়নি পুলিশ। মামলার এজাহারে পুলিশকে অভিযুক্ত করে পরিবার। হাসান আলীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারের দাবিতে রবিবার দুপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন তার পরিবার ও এলাকাবাসী। মামলা না নিলেও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং এবং তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মাসুদ রানার বাসা থেকে হাসান আলী নামে এক জুতা ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
হাসানকে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী বীথি বেগম শনিবার রাত ১১টার দিকে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত এজাহার দেন। এজাহারে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। অপর দুজন হচ্ছেন শহরের স্টেশন রোডের জুতা ব্যবসায়ী রুমেল হক ও খলিলুর রহমান ওরফে বাবু মিয়া। অভিযোগ দায়েরের ১৮ ঘণ্টা পর রবিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি পুলিশ।
এজাহারে লেখা হয়, ‘জেলা শহরের স্টেশন রোডে আমার স্বামীর আফজাল সুজ নামের জুতার দোকান রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানা (৪২) একজন দাদন ব্যবসায়ী। ব্যবসা চলার সময় মাসুদ রানার কাছে দেড় লাখ টাকা নেন আমার স্বামী। এ টাকা সুদে-আসলে বর্তমানে ১৯ লাখে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন মাসুদ রানা। সম্প্রতি মাসুদ রানা টাকার জন্য আমার স্বামী হাসান আলীকে চাপ দেন। একপর্যায়ে গত ৫ মার্চ সকালে লালমনিরহাটের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে আমার স্বামীকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে আসেন মাসুদ। তিনি তাকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় নিজ বাসায় আটকে রাখেন। এরপর টাকা নিয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে মাসুদের তর্কবিতর্ক হয়। টাকার জন্য তিনি আমার স্বামীকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের হুমকি দেন। এসব নির্যাতনের কথা ফোনে জানতে পেরে আমি স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় স্বামীকে উদ্ধারের চেষ্টা করি। স্বামীকে উদ্ধারের জন্য ওই বাড়িতে যাই। কিন্তু টাকা না দিলে মাসুদ আমার স্বামীকে ছেড়ে না দিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করবে বলে হুমকি এবং আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন’।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যায় বীথি স্বামীকে উদ্ধারে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর রহমান ও উপপরিদর্শক (এসআই) মোশারফ হোসেন এবং একজন অজ্ঞাতনামা পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদের বাড়ি থেকে তার স্বামীকে সদর থানায় নিয়ে আসেন। একই দিন রাতে তাদের উপস্থিতিতে পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর তা স্বামীকে স্ত্রীর জিম্মায় না দিয়ে মাসুদের পক্ষ নেন। তিনি মাসুদের টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং বীথিকে ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বলেন।
বীথি অভিযোগে বলেন, ‘আমি তাতে সম্মত না হলে মজিবুর আমার স্বামীকে মাসুদের জিম্মায় দেন। এরপর দলীয় ক্ষমতার দাপটে মাসুদ আমার স্বামীকে এক মাস আটকিয়ে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন। আমি অনেকভাবে চেষ্টা করেও আমার স্বামীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হই। গত শুক্রবার রাতে আমার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করে বসতবাড়ির বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরদিন শনিবার সকালে আমি মাসুদের বাড়িতে গিয়ে দেখি, আমার স্বামীর লাশ ঝুলে আছে। মাসুদ ও তার সহযোগিরা পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে’।
এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। কমিটির আহ্বায়ক হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রাহাত গাওহারী, সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) আবু খায়ের ও পুলিশ পরিদর্শক আবদুল লতিফ মিয়া।
কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে লতিফ মিয়া বলেন, তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রবিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বলেন, হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানার কোনো কর্মকর্তা জড়িত বা তাদের গাফলতি আছে কি না, তা তদন্তে শনিবার ঘটনার দিনই কমিটি করা হয়েছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
মামলা গ্রহণে বিলম্ব করার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, আমাদের কাছে যে কেউ অভিযোগ দিতে পারে, তা আমরা যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করে থাকি। হাসানের স্ত্রী যে এজাহার দিয়েছেন, তা মামলা হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এজাহার থেকে কারো নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদের বাসা থেকে হাসানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। জানতে চাইলে সদর থানার ওসি মাহফুজার বলেন, হত্যা না আত্মহত্যা, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আটক করা আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার হাতে হাসানকে তুলে দেওয়া প্রসঙ্গে পরিদর্শক মজিবুর রহমান বলেন, ওসি সাহেবের নির্দেশে এসআই মোশারফ বাড়ি থেকে মাসুদ ও হাসানকে থানায় নিয়ে আসেন। পরে তারা সালিশ করে। হাসানকে মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
এ প্রসঙ্গে সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান বলেন, পুলিশ মাসুদের হাতে হাসানকে তুলে দেয়নি। থানা চত্বরে সালিশ বৈঠকের পর হাসান, তার স্ত্রী বীথি, মাসুদসহ উভয়পক্ষের লোকজন একসঙ্গে পায়ে হেঁটে থানা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তারা কী করেছেন, পুলিশ তা জানে না।
