চৈত্রসংক্রান্তির তিতা বনাম বৈশাখের ইলিশ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২১, ১১:৩৪ পিএম

এক ঋতু থেকে আরেক ঋতু। এক মাস থেকে আরেক মাস। সময়ের পালাবদলের সন্ধিক্ষণটি খুবই জরুরি। এ সময় প্রকৃতিতে থাকে নানা নির্দেশনা। প্রকৃতির এ নির্দেশনাগুলো মেনেই নানা সমাজে নানা ভূগোলে দিনযাপনের নানা কৃত্য। নানা পরব, নানা আয়োজন। মাসের শেষ দিনটি সংক্রান্তি এবং প্রথম দিনটি ‘মাস পয়লা’ হিসেবেই পালিত হয় গ্রামীণ জনপদে। মাস বা বছরের প্রথম দিন নয়, গ্রামীণ নিম্নবর্গ গুরুত্ব দেয় মাসের শেষ দিন, ঋতুর সন্ধিক্ষণকে। এটি বদলে যাওয়ার ক্রান্তিকাল। আর তাই ঐতিহাসিকভাবেই বাংলা মাসের শেষ দিনগুলো সংক্রান্তির দিন হিসেবে নানা আয়োজন ও কৃত্যে মুখর হয়ে ওঠে। বৈশাখে ভাটিপরব, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কর্মাদি, শ্রাবণে করন্ডি, ভাদ্রে কারাম, আশ্বিনে দাসাই, কার্তিকে জালাবর্ত, অগ্রহায়ণে ওয়ান্না, পৌষে পুষরা, মাঘে বাঘাই শিরনি, ফাল্গুনে ঘাটাবান্ধা আর চৈত্রে চইতপরব বা চৈত্রসংক্রান্তি। এক এক ঋতুতে প্রকৃতি নানা প্রাণের ভেতর দিয়ে তার সমাপনী ও শুরুর নির্দেশনা জানায়। প্রকৃতির নয়া শস্য ফসল গ্রহণ ও ব্যবহারের জন্য অনুমতি প্রার্থনা ও আশীর্বাদের তরে নানা সমাজ আয়োজন করে নানা কৃত্য। ফাল্গুনে ভাঁট, শাল, মহুয়া, মিষ্টিকুমড়ো, বিলিম্বি, ভেন্না, আমরুল, নাগেশ্বর, পলাশ, কাঁঠালিচাঁপা, দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা ফোটে। প্রকৃতি জানান দেয় বসন্ত ঋতু এসেছে। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এ সময় ভাঁট ফুল দিয়ে ঘাটাবান্ধা বর্ত করা হয়, গোপালগঞ্জের চলনবিলে মিষ্টিকুমড়োর ফুল দিয়ে শিশুরা হেঁচড়া পূজা করে, আর সাঁওতাল সমাজ শাল-মহুয়ার ফুলে আয়োজন করে বাহা। চৈত্র দিনে মাটি রুক্ষ হয়, কালবৈশাখী ছোটে। শিলাবৃষ্টি থেকে ধানের জমিন রক্ষায় শিরালেরা রাত-দিন মন্ত্র জপে হাওরাঞ্চলে। চৈত্রের শেষ দিন বা সংক্রান্তি বাঙালি কি আদিবাসী দেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের জীবনে এক গুরুত্ববহ আখ্যান। চারপাশের প্রকৃতির নির্দেশনায়ই এ আখ্যান গড়ে উঠেছে। সুন্দরবন অঞ্চলে বাঙালি সনাতন হিন্দুদের ভেতর চৈত্রসংক্রান্তির দিন মাটি দেয়ে কুমিরের প্রতিকৃতি বানিয়ে দেলপূজা করা হয়। বরেন্দ্রভূমিতে চৈত্রসংক্রান্তিতে কুমির বানানোর চল নেই। সুন্দরবন অঞ্চলে কুমির আছে বলেই হয়তো তা কৃত্যের আরাধ্য হয়েছে।

ভাওয়াল ও মধুপুরগড়ের বর্মণ ও কোচ আদিবাসীরা সন্ন্যাসীপূজা, গাজন, চড়কপূজার মাধ্যমে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা এ উৎসবকে বলেন বিষু। সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের আদিবাসীদের অনেকেই এ সময় পালন করেন দ-বর্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বর্ষবিদায় ও বরণের এ উৎসবকে বলেন, বিজু। মারমারা বলেন, সাংগ্রাই। রাখাইনদের ভাষায়, সাংগ্রেং। ত্রিপুরারা বলেন, বৈসু বা বৈসুক কোথাও বুইসুক। গুর্খা ও অহমিয়ারা বলেন, বিহু। তঞ্চংগ্যারা বলেন, বিষু। ম্রোরা এ উৎসবের নাম দিয়েছেন চানক্রান। চাক আদিবাসীরা এ উৎসবকে বলেন, সাংগ্রাইং। খিয়াং আদিবাসীদের অনেকেই এ উৎসবকে সাংলান বলে থাকেন। নাটোরের চলনবিল অঞ্চলের বাগদী সমাজ চৈত্রসংক্রান্তির দিন নীলকণ্ঠ পূজা করে। বৈশাখের প্রথম দিনে গোয়ালঘরে আয়োজন করে ‘দুধ-উদলানো’ কৃত্য। গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে সেই দুধ গোয়ালঘরের মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। বছরের প্রথম দিনে এভাবেই ভূমিজননীকে দুধ দিয়ে নতুনবার্তা বয়ে আনার আহ্বান জানায় বাগদী সমাজ। যাতে বছরজুড়ে গোয়ালভরা সুস্থ দুধেল গরু থাকে, সংসারের আয়-রোজগার ভালো হয়, সংসারের মঙ্গল হয়। রবিদাসদের ভেতর হাজরা-কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে। বছরের প্রথম দিন ঘরের দেওকুড়ি নামের পবিত্রস্থলে কর্মের পূজা করা হয়। রবিদাসদের ভেতর যে যে কর্মপেশায় জড়িত তারা সেই কর্মের সঙ্গে জড়িত আনুষঙ্গিক উপকরণগুলো দেওকুড়িতে রাখে। হাতুড়ি, কোদাল, শাবল, কাঁচি, ছুরি, বাটাল যার কর্মে যা লাগে সব। এ সময় ঢোল, খাজরি, ঝাল বাজানো হয়। রবিদাসদের ভেতর এ সময় বাইশাখী পূজাও পালিত হয়। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানা জাতের তিতা শাক খায়। ছাতাপরব ও পাতাপরবের ভেতর দিয়ে আয়োজিত হয় সাঁওতালদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণপর্ব। এ সময় বাড়ির সব গাছের গোড়ায় নতুন মাটি তুলে দিতে হয়। নতুন বছর যেন ফুলে-ফুলে-শস্য-ফসলে ভরপুর থাকে গাছগাছালি এই মানতে। বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য হিসেবে মু-ারা গ্রামপূজা হিসেবে পালন করে মুড়ই-পূজা।

ফুল বিজু, মূল বিজু ও গয্যাপয্যা দিন এ তিন পর্বে বিভক্ত চাকমাদের বিজু উৎসব শুরু হয় বাংলা চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ। পাহাড়-টিলা-বন ও গ্রাম ঘুরে ঘুরে এদিনে শিশু, কিশোর ও বালিকারা সংগ্রহ করেন নানা পদের ফুল। ভাতজরা ফুল বা বেইফুল ছাড়া বিজু জমে না। ভাতজরা ফুল বিজুর সময়ে ফুটে বলে অনেকে একে বিজু ফুলও বলে। সাংগ্রাইং উৎসবের প্রথম দিনকে চাকরা বলেন, পাইংছোয়েত বা ফুল দিন। চাকরা সাংগ্রাইংয়ের সময় কাইনকো বা নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বর্ষবিদায় ও বরণের উৎসবকে সাঁওতাল সমাজ বাহা পরবের ভেতর দিয়ে পালন করে। এ সময় গাছে গাছে সারজম, ইচৗক, মুরুপ আর মহুয়া ফুল ফোটে। বাহা পরবের ভেতর দিয়েই সাঁওতাল সমাজ এসব ফুলের মধু পান ও ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রকৃতির কাছে। চৈত্রসংক্রান্তির দিন হাওরাঞ্চলে বেগুন পাতার বর্ত পালিত হয়। ১৩টি বেগুন পাতায় নানা জাতের অন্ন ব্যঞ্জন ও নতুন ফল ফলাদি উৎসর্গ করা হয়। গিমা তিতা, নাইল্যা, গিমা, দণ্ডকলস, আমরুল, থানকুনি, নিম, নিসিন্দা, তেলাকুচো, মালঞ্চ, কানশিরা এ রকমের ১৩ থেকে ২৯ রকমের তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার চল আছে দেশের নানা জনপদে। ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ নি¤œবর্গের জীবনে চৈত্রসংক্রান্তি কি মাসপয়লা বা ‘নববর্ষের’ দিন ইলিশ মাছ খাওয়ার চল নেই। কারণ দেশের সর্বত্র ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। তা ছাড়া এ সময়টা ইলিশের মৌসুম পর্যন্ত নয়। ঋতুর ক্রান্তিকালকে জানা-বোঝার তরে, প্রকৃতির জটিল সন্ধিস্থলের সঙ্গে সংলগ্ন হওয়ার মানতেই নিম্নবর্গের কৃত্যসমূহ বিকশিত হয়েছে। এসব কৃত্যপ্রাণ ও প্রকৃতির বিজ্ঞান আগলে চলে। আর তাই বর্ষবিদায় জানাতে সংক্রান্তির দিন তিতা শাক, শাল-মহুয়া ফুল, নাগেশ্বর বা কুমির হয়ে ওঠে কৃত্য-পরবের অনন্য উপাদান। কারণ প্রকৃতি এসবের ভেতর দিয়েই তার বদলে যাওয়ার নির্দেশনা জানান দেয়।

দেশে নিম্নবর্গের বর্ষবিদায় ও বরণের বৈচিত্র্যময় কৃত্য-ব্যঞ্জনা থাকা সত্ত্বেও বিস্ময়করভাবে চলতি সময়ে নববর্ষ উদ্যাপনের এক বাহাদুরি রূপ দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে যার কোনো কৃত্যমূলক সম্পর্ক নেই। দিনে দিনে নববর্ষকে পান্তা আর ইলিশের রূপকল্প হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। দেশের সবখানে ইলিশ মেলে না, তা ছাড়া এটি ইলিশ ধরার মৌসুমও নয়। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায়, কিছু ধনীর হাতে দেদার টাকা থাকায় নদী কি সমুদ্র সবখান থেকেই নানা মাপের ইলিশ এ সময়টায় চলে আসে খাবার পাতে। তবে সরকার এ সময়টায় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। ১৯৮৫ সালের মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইনটি ২০১১ সালে সংশোধন করে আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমার দিন এবং এর আগের ও পরের পাঁচ দিনসহ ১১ দিন ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহন, বিপণন ও মজুদ নিষিদ্ধ করে সরকার। নববর্ষের দিন পান্তা ভাত আর ইলিশ খাওয়ার প্রচলনটি একেবারেই এক বেমানান ও প্রকৃতিবিরোধী প্রচারণা। হুজুগে পান্তা-ইলিশে আসক্ত হয়ে ওঠা এক শহুরে প্রজন্ম একই সঙ্গে জানান দিচ্ছে তার সঙ্গে পঞ্জিকা, সংক্রান্তি, বর্ষবিদায়, বর্ষবরণ এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের কোনো সম্পর্কই নেই। ইলিশের ভেতর দিয়েও প্রকৃতি তার রূপান্তরের নির্দেশনা জানান দেয়, তবে এটি চৈত্র বা বৈশাখে নয়। অন্য সময়, অন্য ঋতুতে। নিম্নবর্গের দর্শন ও বীক্ষা বুকে আগলে প্রকৃতির ব্যাকরণে তাই শামিল হওয়া জরুরি। ইলিশ নয়, বর্ষবিদায় ও বরণ তিতা শাকের মাধ্যমেই আরও জুতসই কায়দায় আমাদের গ্লানি ও জরা ধুয়ে-মুছে নিতে পারে। নতুন দিনের জন্য প্রকৃতির কাছে নতজানু হতে সাহসী করে তোলে।

লেখক গবেষক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত