শীতলক্ষ্যায় ৩৪ লাশ: কার্গো চালকের বেপরোয়া গতি, সেতুর নির্মাণ ত্রুটি দায়ী

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৪২ পিএম

শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবিতে ৩৪ জন নিহতের ঘটনায় গঠিত নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ২৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এতে এমভি এসকেএল-৩ নামক পণ্যবাহী কার্গোর চালকের বেপরোয়া গতি এবং সেতুর ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজকে দায়ী করা হয়েছে।

একই সঙ্গে কয়লাঘাট এলাকায় নির্মাণাধীন সেতুর নির্মাণ কার্যক্রমে ত্রুটির কথাও উল্লেখ রয়েছে কমিটির জমা দেওয়া ২৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে।

সোমবার (১২ এপ্রিল) জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি।

গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৫টা ছাপ্পান্ন মিনিটে মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায় এমএল সাবিত আল হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চটি। আনুমানিক সোয়া ৬টার দিকে মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর অদূরে এমভি এসকেএল-৩ নামে একটি কার্গো জাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দেয় যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে।

সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, লঞ্চটিকে ঠেলে অন্তত ২০০ মিটার দূরে টেনে নিয়ে যায় কার্গো জাহাজটি। এর মধ্যেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কয়েকজন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, রাতেই অন্তত ৩০ যাত্রী সাঁতরে জীবিত অবস্থায় নদী পার হতে সক্ষম হন। প্রাণ হারান ৩৪ যাত্রী। নিহতদের সাতজন শিশু, ১৩ জন পুরুষ ও ১৪ জন নারী।

লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন যুগ্ম সচিব আব্দুল ছাত্তার শেখ। কমিটি নৌ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

তাদের প্রতিবেদনে বলছে, পণ্যবাহী জাহাজটির বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। একই সঙ্গে শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর পিলার নদীর মধ্যে স্থাপন করায় এবং নৌপথে প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী রাখায় নৌপথ সরু হয়ে যাওয়া দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তবে কার্গো জাহাজে প্রথম শ্রেণির সনদধারী চালক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে, সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানো, ছোট আকারের সানকেন ডেকবিশিষ্ট লঞ্চ ক্রমান্বয়ে সরিয়ে দেওয়া, অলস জাহাজ যত্রতত্র পার্কিং বন্ধসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি ২৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এসকেএল-৩ নামক পণ্যবাহী জাহাজের মাস্টার, ড্রাইভারের জবানবন্দি, ডুবে যাওয়া লঞ্চ সাবিত আল হাসানের বেঁচে যাওয়া মাস্টার, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রায় তিন পৃষ্ঠাজুড়ে রয়েছে সুপারিশ ও দুই পৃষ্ঠায় রয়েছে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের নাম ও দায়িত্ব।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার কমিটির সদস্যসচিব বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের বেঁধে দেওয়া সাত কর্ম দিবসের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটি প্রথম শ্রেণির মাস্টার ওয়াহিদুজ্জামান চালাচ্ছিলেন। অপর দিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চে তৃতীয় শ্রেণির চালক জাকির হোসেন ছিলেন। কার্গো জাহাজের চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এদিকে জাহাজটির রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) থাকলেও সার্ভে রিপোর্ট ছিল না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সার্ভে রিপোর্ট ছাড়া চলাচল করে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ-১৯৭৬ এর সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন করেছে জাহাজটি।

লঞ্চডুবির ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় হত্যার উদ্দেশ্যে বেপরোয়া গতিতে পণ্যবাহী জাহাজ চালিয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চটি ডুবিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে আসামির তালিকায় কারো নাম উল্লেখ ছিল না। এমনকি জাহাজের নাম ও নম্বরও উল্লেখ ছিল না মামলায়। মামলাটি তদন্ত করছে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশ।

তবে গত ৮ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পাঁচ শ মিটার দূরে নোঙর করা অবস্থায় পণ্যবাহী এসকেএল-৩ জাহাজটিকে আটক করা হয়। এ সময় ঘাতক জাহাজের মাস্টার, সুকানি, গ্রিজারসহ ১৪ স্টাফকেও গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের মধ্যে মাস্টার, চালকসহ পাঁচজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে নৌ পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত