‘সবাই ভালো আছে, আমাগো দেখার কেউ নাই। একবার সরকার থেইকা ত্রাণ দিছিল, এক ত্রাণ দিয়া কি আর সংসার চলে। তাও সবাই ত্রাণ পায় নাই। পোলা-মাইয়ার পড়ালেখা বাদ দিয়া দিছি। বাড়ি ভাড়ার জন্য চাপ দিতেছে বাড়িওয়ালা, কয়, হান্ডি-পাতিল নিয়া বাইর হন, এই সুখে আছি আমরা বুঝলেন’।
এভাবেই ক্ষোভের কথা বলছিলেন পরিবহন শ্রমিক মো. রাজিব।
শুধু রাজিব নন, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এরকম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। পকেটে নাই টাকা। বাসায় চাল নাই। কাজের ব্যস্ততা নাই। লকডাউনে সব গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অসহায় অলস সময় পার করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। দূরপাল্লা বাস শ্রমিকদের বর্তমান সময়ে এই দশা চোখে পড়ার মতো। গাড়ির চাকা ঘুরলেই ঘুরে তাদের জীবনের চাকা। প্রতিদিনের উপার্জনের টাকা দিয়েই চলে পুরো সংসার।
মধ্যবয়সী এক বাসের সহকারী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘কী বলব ভাই, আমাদের আর অবস্থা। বাসে হেলপারি করি। দিন আনি দিন খাই। এখন তো আমাগো গাড়ি চলে না। কীভাবে যে প্রত্যেক দিন সংসারটা চলে আল্লাহ জানে আর আমি জানি। ঈদে পুলাপানের মুখে সেমাই দিতে পারমু না। গত বছর ফতুল্লা থানা থেকে একটা সিলিপ পাইছিলাম ত্রাণের, ত্রাণ নিতে গিয়া হুনি ত্রাণ নাকি শেষ, পরে দিব। পকেট থেকে বের করে সেই ত্রাণের জন্য পাওয়া টোকেন দেখান তিনি। এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো সেই ত্রাণের আশায় নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন টোকেনটি’।
গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন ওয়ার্কশপের মালিক-কর্মচারীরা। গাড়ির চাকা না ঘুরলে তাদেরও রোজগার বন্ধ থাকে।
ইঞ্জিনমিস্ত্রি দিপংকর হালদার জানান, ‘আমাদের কোনো কাজই নাই, বড় গাড়ি না চল্লে আমগো কোনো কাম থাকে না। আমরা এখন ধারদেনা কইরা চলতাছি। আমার দোকানে একটা কর্মচারি কাম করে। ওরে আসতে নিষেধ করে দিছি। ও আইস্যা কী করব। ওরে রোজের টেকা কইত্তে দিব’।
বড় গাড়ির চাকা মেরামত করান নাজমুল মিয়া কিন্তু গত প্রায় দেড় মাসের লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সংকট তার পিছু ছাড়েনি।
তিনি বলেন, ‘কোনোদিন খাইয়া থাকি কোনোদিন না খাইয়া। বাসায় সন্তান আছে তাগোরে (তাদের) তো না খাওয়া রাখতে পারি না। ওদের তো আর কোনো দোষ নাই যে, ওর বাপ কিছু করতে পারে না, ওদের ঠিকমতো খাওন দিতে পারে না।’
কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলছিলেন নাজমুল মিয়া।
আনন্দ পরিবহনের হেলপার মো. মামুন জানান, ‘আমাদের তো কোনো বেতন নাই। গাড়ি চললে আমাদের সংসার চলে। অনেক মানুষের কাছে থেকে ধারদেনা করে চলতে হইতাছে। এখন এই পরিস্থিতিতে কেউ ধারও দিতে চায় না। আমরা তো কোনোদিন পড়াশোনা করি নাই, ইচ্ছা ছিলো ছোট মেয়েটাকে পড়াশোনা করাব। গত মাসে মেয়ের টিউশন বন্ধ করে দিয়েছি। এই অবস্থায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। মেয়ের পড়াশোনা কিভাবে করাব’।
এদিকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আয় কমে গেছে বিভিন্ন তেলের পাম্পে। সেখানেও কোনো গাড়ি আসে না তেল নিতে। যার ফলে বেতনভুক্ত হওয়ার পরও, মাস শেষে সম্পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন না তেলের পাম্পে কাজ করা কর্মচারীরা।
কর্তৃপক্ষের দাবি, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিক্রি কমে গেছে, তাই সম্পূর্ণ বেতন দিতে পারছেন না তারা। কর্মচারীদের কিছুটা বেতন দিয়ে আপাতত চালাচ্ছে তেলের পাম্প। এভাবে যদি গাড়ির চাকা বন্ধ থাকে তাহলে ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে, পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বঙ্গবন্ধু সড়কের ‘মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে’র ক্যাশিয়ার নাজমুল হোসেন জানান, ‘আমাদের রেগুলার ডিউটি টাইম অনুযায়ী আমারা ডিউটি করছি। মাস শেষে বেতন সম্পূর্ণ পাচ্ছি না। মালিকপক্ষই বা কী করবে, তাদেরও তেমন সেল নেই। এই অবস্থায় কোনো রকম সংসার চালাচ্ছি। কোনো রকম ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি। আমরা এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ বা কোনো সরকারি অনুদানের টাকা পাইনি। আমাদের খবর নেয়ার মতো কেউ নাই’।
বঙ্গবন্ধু সড়কের অপর আকেটি তেলের পাম্প প্রান্তিক সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার বিল্লাল হোসেন প্রতিবেদককে জানান, ‘আমাদের তেলের পাম্প শহরের একেবারে প্রান্তে, আমরা লকডাউন মানি এবং আমরা চাই লকডাউন হোক, লকডাউনের কারণে যদি সংক্রমণ কমে মানুষের মৃত্যু কমে যায়। তাহলে আমরা লকডাউন চাই। কিন্তু আমাদের তো না খেয়ে মরতে হবে এই পরিস্থিতিতে। যদি স্বস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালু করে। তাহলে আমরাও চলতে পারব, মানুষও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে’।
