সন্তানরা মা-বাবার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তাদের সুশিক্ষা দেওয়া, শরিয়তের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শেখানো এবং ইমানদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা মা-বাবা ও অভিভাবকের কর্তব্য। সন্তানকে সত্য বলা, হালালের গুরুত্ব, মিথ্যা না বলা, বড়কে শ্রদ্ধা করা, ছোটকে স্নেহ করা, মানুষকে তুচ্ছ না করার মতো বিষয়গুলো শেখানোও পিতা-মাতার কর্তব্য। সেই সঙ্গে তাদের ইসলামি সভ্যতা, শরিয়তের মৌলিক বিষয়াদি শেখানো এবং নামাজি ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও দায়িত্ব। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘জেনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাদের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’ সহিহ বোখারি : ৮৯৩
সুসন্তান যেমন মা-বাবার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের বড় সম্পদ এবং সদকায়ে জারিয়া তেমনি সন্তান যদি শরিয়তের অনুগত না থাকে, দুর্নীতি ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে তাহলে সে উভয় জগতেই মা-বাবার জন্য বিপদ। দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও চিন্তার কারণ। আর কবরে থেকেও মা-বাবা তার গোনাহের ফল ভোগ করবে। আখেরাতে এই সন্তানই আল্লাহর দরবারে মা-বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে যে, তারা আমাকে দ্বীন শেখায়নি। তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তাই সন্তানদের যথাযথ হক আদায়ের প্রতি যতœবান হতে হবে।
সন্তানের জন্য সুষম খাবার যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন নামাজের শিক্ষা, তার কাপড়ের যেমন প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন সুশিক্ষা। বাড়ির বাইরের মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার যেমন দরকার, বাড়িতেও দরকার ভদ্রতাবোধ বজায় রেখে চলা। এ বিষয়ে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের সন্তানদের নামাজের আদেশ দাও যখন তাদের বয়স সাত বছর হবে।’ আবু দাউদ : ৪৯৫
বর্ণিত হাদিসে সন্তানের বয়স দশ বছর হলে তার শোয়ার বিছানা পৃথক করার হুকুম এসেছে। অবশ্য অন্য আরেক বর্ণনায় সাত বছর বয়সেই বিছানা পৃথক করে দেওয়ার কথা এসেছে। মুসতাদরাকে হাকিম : ৭৩৪
ইসলামি স্কলাররা বর্ণিত হাদিসের ওপর ভিত্তি করে সন্তানের বয়স দশ বছর হলে তার শোয়ার বিছানা পৃথক করে দেওয়াকে ওয়াজিব বলেছেন। এ বয়সে ছেলের জন্য মার সঙ্গে এবং মেয়ের জন্য বাবার সঙ্গে একই বিছানায় শোয়া নিষেধ। অবশ্য বাবার সঙ্গে এক ছেলে এবং মায়ের সঙ্গে শুধু এক মেয়ের একই বিছানায় শোয়ার অবকাশ আছে।
বিছানা পৃথক হওয়ার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক সন্তানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রুমের ব্যবস্থা করে দিতে হবে; বরং একই রুমে ভিন্ন খাট কিংবা ভিন্ন বিছানার ব্যবস্থা করলেও চলবে। আর যদি তাদের জন্য পৃথক পৃথক বিছানার ব্যবস্থা সম্ভব না হয় বরং সবাইকে এক বিছানায় রাতযাপন করতে হয় সেক্ষেত্রে এ বয়সের সন্তানদের মধ্যে কোল বালিশ অথবা এ ধরনের কোনো কিছু দিয়ে হলেও আড়াল রাখা আবশ্যক। আর মেয়েদের বিছানা বাবা ও ছেলেদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শুধু কোল বালিশ রাখা যথেষ্ট নয়। আদ দুররুল মুখতার : ৬/৩৮২
কোনো সন্তান দ্বীনি কথা না শুনলে পিতা-মাতার কর্তব্য হলো তাদের নামাজ আদায়ের কথা হেকমতের সঙ্গে বলতে থাকা। নামাজ পড়ার লাভ এবং না পড়লে কী ক্ষতি ও শাস্তি রয়েছে তা শোনানো। এছাড়া শরিয়তের অন্যান্য হুকুম-আহকাম মেনে চলতে উৎসাহ দিতে থাকা। ইনশাআল্লাহ এতে তাদের উপকার হবে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কারণ উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসবে।’ সুরা যারিয়াত : ৫৫
সন্তানকে নামাজসহ দ্বীনের জরুরি বিষয়াদি, কোরআন মজিদ ও ইমান-আকিদার কথা শেখানো, নেক ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করা, সুন্নত ও আদব আখলাক শিক্ষা দেওয়া, পিতা-মাতার দায়িত্ব। সন্তানকে দ্বীনিভাবে গড়ে তোলার জন্য শৈশব থেকেই পিতা-মাতাকে যতœবান হওয়ার প্রতি হাদিসে গুরুত্ব এসেছে। তাই সন্তানের লেখা-পড়ার বয়স হয়ে গেলে তখন থেকেই তাকে কোরআন শিক্ষা দিতে হবে। আর সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দিতে হবে। আর দশ বছর বয়স হলে নামাজের জন্য জোর তাগিদ দেবে। নামাজের জন্য এ বয়সে প্রয়োজনে হালকা শাস্তিও দেওয়া যাবে। এভাবে শরিয়তের প্রত্যেকটি বিধি-বিধানের প্রতি শৈশব থেকেই যতœবান হলে ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে সন্তান ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে বড় হবে। এক্ষেত্রে তার বিধর্মী হওয়া বা মা-বাবার অবাধ্য হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
