বিশ্বে বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা মহামানব গৌতম সম্যক সম্বুদ্ধের মহাজীবনের প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় অধ্যায়। জন্ম-জন্মান্তরের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা আর সাধনায় সর্বশেষ জন্মে এই পৃথিবীতে মানব সন্তান হিসেবে জন্ম পরিগ্রহ, ত্রিবিধ প্রকারে ত্রিশ প্রকার পারমীর পরিপূর্ণতায় সর্বজ্ঞতা জ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ এবং ৪৫ বছরব্যাপী দেব-মানব ও অন্যান্য সকল প্রাণীর সার্বিক কল্যাণে বিমুক্তি মার্গের অমৃতসুধা বিতরণ করে অনিত্যতার প্রমিত নিয়মে মহাপরিনির্বাণ লাভের ঘটনায় মহিমান্বিত এই মহাতিথি বুদ্ধ পূর্ণিমা।
সমগ্র বিশ্ব অবগত আছে— সমতা, স্বতন্ত্রতা, বন্ধুত্ব, ন্যায়, সত্য, অহিংসা, মৈত্রী ও করুণাসম্পন্ন মানবতার জনক, বিশ্বমানবতার প্রতীক তথাগত ভগবান বুদ্ধের জীবনের তিনটি মহিমান্বিত ঘটনায় পরিপূর্ণ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। কোভিড-১৯ এর কারণে আজ মানবতা বিপন্ন হতে চলেছে। মহান বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক শুভেচ্ছা বার্তায় বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বে করোনা মহামারিতে লড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বুদ্ধের শিক্ষা’। বুদ্ধ পূর্ণিমার ঠিক আগে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সমগ্র পৃথিবীকে বুদ্ধের প্রদত্ত শিক্ষা পালন করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ হতে আড়াই হাজার বছর পূর্বে ভগবান বুদ্ধ “সংঘং সরণং গচ্ছামি” বা একতাবদ্ধ হয়ে থাকার কথা বলেছিলেন। একতাবদ্ধ থেকে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্য ভুলে একে অপরকে সাহায্য করতে, সহানুভূতি প্রদর্শন করতে এবং মানব তথা সমস্ত জীবকে সেবা করতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। এ জন্য আজ বুদ্ধের বার্তা অতীব মহত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জাতিসংঘের মহাসচিব আরও বলেছেন, ‘যখন আমরা ভগবান বুদ্ধের জন্ম, তাঁর বুদ্ধত্ব লাভ এবং তাঁর মহাপরিনির্বাণ স্মরণ করছি, তখন তাঁর শিক্ষা হতেই আমাদেরকে অধিকতর প্রেরণা নেওয়া উচিত। মানবতা আজ কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি দ্বারা পীড়িত। এ রকম পরিস্থিতিতে বুদ্ধের এক সূত্র আমার মনে পড়ছে। বুদ্ধ বলেছেন, ‘শরীরধারী সকল মনুষ্যই রোগগ্রস্ত। এ জন্য আমিও রোগগ্রস্ত’। গুতেরেস তাই বলেছেন, ‘ভগবান বুদ্ধের একতাবদ্ধ হয়ে এক অন্যের সেবা করা, পাশে থাকার শিক্ষা পূর্ব হতে বর্তমানেও অধিকতর মহত্বপূর্ণ প্রমাণিত হচ্ছে। সে জন্য আমরা সবাই মিলেই করোনা ভাইরাসকে নির্মূল করতে পারব এবং এ সংকটের সমাধান করতে সক্ষম হবো। পবিত্র এ বৈশাখ দিবসে সমগ্র বিশ্ববাসীর প্রতি আমার এ আবেদন রইল।’
বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অত্যন্ত পবিত্র, স্মরণীয়-বরণীয় তিথি ও অনুষ্ঠান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব। থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম প্রভৃতি বৌদ্ধপ্রধান দেশে এই পূর্ণিমা পবিত্র ‘বৈশাখ’ নামে সুপরিচিত। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনটি জাতিসংঘ কর্তৃক ‘বেসাক ডে’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এতদুপলক্ষে জাতিসংঘসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহামানব গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। বৌদ্ধ বিশ্বে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় ও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপন করা হয়। কিন্তু বর্তমান কোভিড-১৯ এর কারণে সমগ্র বৌদ্ধ বিশ্বে খুব সীমিত পরিসরে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপন করছে। বিশ্ব যাতে দ্রুত করোনা মুক্ত হয় সেই কামনা করছে প্রতিটি বৌদ্ধ প্যাগোডায়। বিশ্ব মঙ্গল ও সকল প্রাণীর হিত—সুখ কামনা ছিল মহান বুদ্ধের দৈনন্দিন ব্রত। সেই নীতিকে ধারণ করে এই বিশ্ব অতিমারিতে বৌদ্ধরা সকল প্রাণীর সুখ কামনা করছে অবিরত।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দ এক মহা-গৌরব দীপ্ত ও যুগান্তকারী বর্ষ হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে হিরণ্ময় জ্যোতিতে দেদীপ্যমান। এই অবিস্মরণীয় বর্ষের এক শুভক্ষণে নেপালের কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেন এক রাজকুমার। পিতা শাক্যরাজ শুদ্ধোধন ও মাতা মহারানি মায়াদেবীর সন্তান-সন্ততি লাভের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার ফলশ্রম্নতি এই রাজকুমার। সন্তান লাভে আশা বা উদ্দেশ্য পূরণ কিংবা পরিতৃপ্তির অপরূপ ব্যঞ্জনায় রাজকুমারের নামকরণ করা হয় সিদ্ধার্থ। জন্মের সাত দিন পর সিদ্ধার্থ মাতৃহারা হলে পরবর্তীতে তার মাসি-মা তথা রানি মহাপ্রজাপতি গৌতমী কর্তৃক শিশু সিদ্ধার্থ লালিত-পালিত হওয়ায় তিনি সিদ্ধার্থ গৌতম নামেও পরিচিতি লাভ করেন। এই সিদ্ধার্থ গৌতমই পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্ব ইতিহাসে গৌতম বুদ্ধ নামে অভিষিক্ত হন। শাক্য—রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মদিনই ইতিহাসে বুদ্ধ পূর্ণিমার প্রথম স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা।
শৈশব থেকেই রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম ছিলেন চিন্তাশীল, মেধাবী ও ধ্যানী প্রকৃতির। কৈশোরে তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য উত্তরোত্তর আরও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। ক্রমেই তাঁর মধ্যে অপরিমেয় মানবীয় গুণাবলি প্রকাশ পেতে থাকে। জন্মের পর জ্যোতিষীদের গণনায় জানা যায়, রাজকুমার হয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হবেন অথবা সন্ন্যাসে গমন করে পূর্ণজ্ঞানী মহাপুরুষ হবেন। এটা জেনেই রাজা শুদ্ধোধন তাঁকে সংসারী করতে বয়সানুক্রমিক ও ক্ষত্রিয়োচিত যাবতীয় বিদ্যাশিক্ষায় পারঙ্গম করে তোলেন। আর জীবনের দুঃখময়তা যাতে রাজকুমারকে একটুও স্পর্শ করতে না পারে সে ব্যাপারে রাজা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। পুত্রের মনোরঞ্জনার্থে তৈরি করা হয় ঋতুপোযোগী রম্মো, সুরম্মো ও সুভকো নামক তিনটি অত্যুত্তম প্রাসাদও। এক সময় রাজা পুত্রের বিয়েরও ব্যবস্থা করেন। এতসব আয়োজন সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ গৌতমের মনে সুখ নেই, শান্তি নেই। একপর্যায়ে রাজকুমার উদ্যান ভ্রমণে গিয়ে প্রথম দিন এক জরাগ্রস্ত লোক, দ্বিতীয় দিন এক অসুস্থ লোক, তৃতীয় দিন শবাধারে এক মৃত লোক ও চতুর্থ দিন এক শান্ত, সৌম্য, সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী দেখলেন। তিনি বুঝলেন, সন্ন্যাস জীবন অবলম্বনই মনে প্রশান্তি এনে দিয়ে জীবন-দুঃখের অবসান ঘটাতে পারে। এর মাঝে তাঁর এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তাকে তিনি রাহু বা গ্রাসকারী হিসেবে বিবেচনায় এনে এক রাতে স্নেহবৎসল পিতা, মমতাময়ী মা, প্রিয়তমা অপরূপা স্ত্রী, আদরের আত্মজ পুত্র, প্রিয় রাজ্য-রাজপ্রাসাদ সবকিছু ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে, অনেক গুরুর সান্নিধ্যে অবস্থান করে কোথাও তিনি দুঃখ নিবৃত্তির সঠিক সমাধান পেলেন না। পরে একাকী কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত হয়েও সফলকাম হলেন না তিনি। অবশেষে সাধনায় ‘মধ্যম পন্থা’ অবলম্বন করে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ভারতের গয়ার বোধিমূলে ধ্যানস্থ হয়ে সিদ্ধার্থ গৌতম লাভ করেন বুদ্ধত্ব। এটি বুদ্ধ পূর্ণিমার দ্বিতীয় স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা। বুদ্ধত্ব বা সর্বজ্ঞতা জ্ঞান লাভের মধ্য দিয়ে তাঁর অধিগত হয় চতুরার্যসত্য, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে দুঃখ নিবৃত্তির সারতত্ত্ব এবং বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনের ইতিবৃত্ত। এতে তাঁর পুনর্জন্ম রহিত হয়। বস্তুত, মহামানব গৌতম বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভ অনেক কল্প-কালের সাধনার ফলশ্রম্নতি। বুদ্ধের অধিগত চতুরার্যসত্য হলো: জীবন দুঃখময় (জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ, প্রিয় বিয়োগ দুঃখ, ঈপ্সিতের অপ্রাপ্তি দুঃখ ও পঞ্চোপাদানস্কন্ধ দুঃখ), দুঃখময় জীবনের কারণ রয়েছে (তৃষ্ণা ও অবিদ্যা), জীবন-দুঃখের অবসান ঘটানো যায় (তৃষ্ণার অশেষ নিরবশেষ বিরাগ নিবৃত্তি, ত্যাগ ও বিচ্ছেদ) এবং জীবন-দুঃখের অবসানের উপায় (আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ: সম্যক বা সৎ দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। এগুলো সংক্ষেপে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা)। বুদ্ধ বলেছেন, চতুরার্যসত্য ব্যতীত জগতে আর কোনো সত্য (ধর্ম) নেই। এই চতুরার্যসত্য যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গমের মাধ্যমে দুঃখ মুক্তির সাধনায় নিবিড়ভাবে নিবিষ্ট থাকলেই দুঃখের অবসানে নির্বাণ অধিগত হয়। নির্বাণ পরম শ্রেয়, পরম সুখ ও পরম শান্তি। বৈশাখী পূর্ণিমায় সিদ্ধার্থ গৌতমের বুদ্ধত্ব লাভ এই পূর্ণিমার এক অবিস্মরণীয় ও জ্যোতির্ময় মাইলফলক।
এক সময় বুদ্ধ নিজেও ধর্মযাত্রায় বের হন। তিনি সারনাথ, রাজগীর, বৈশালী, সংকুল পর্বত, ত্রয়োত্রিংশ স্বর্গ, সুংসুমার গিরি, কৌশাম্বী, পারিল্যেয়্যক বন, নালা, বৈরঞ্জনা, চালিয় পর্বত, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্ত ও আলবীতে বর্ষাব্রত যাপন করে স্থানীয় উল্লেখযোগ্য এলাকাসহ আরও বহু জায়গায় বহু জনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য অমৃতময় নির্বাণ সুধা বিতরণ করেন। অবিরাম ধর্ম প্রচারে বুদ্ধ অতিবাহিত করেন সুদীর্ঘ ৪৫ বছর। শেষ পর্যায়ে তিনি রাজগীর থেকে বৈশালী হয়ে কুশীনগর গমন করেন। তারপর বুদ্ধ পাবা নগর হয়ে মল্লদের শালবনে এসে উপস্থিত হন। বুদ্ধের নির্দেশে তাঁর প্রিয় প্রধান শিষ্য আনন্দ স্থবির যমক-শাল গাছের নিচে অন্তিমশয্যা রচনা করেন। সে শয্যায় শায়িত হয়ে বুদ্ধ আনন্দ স্থবিরসহ সঙ্গী ভিক্ষুদের ডেকে পরপর তিনবার বললেন, ধর্ম বিষয়ে যদি কারও কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন থাকে তবে তথাগতের পরিনির্বাণের পূর্বে প্রশ্ন করতে পারো। ভিক্ষুগণ নীরব থাকলে বুদ্ধ অবশেষে বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ! সমস্ত সংস্কার অনিত্য, ক্ষয়শীল। জ্ঞান-প্রযুক্ত সম্যক স্মৃতি সহকারে অর্থাৎ অপ্রমাদের সাথে নিজ নিজ কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করবে।’ এই ছিল ধরাধামে বুদ্ধের শেষ বাণী। এরপর ক্রমান্বয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে রাতের শেষ যামে ধ্যানের চতুর্থ স্তরে পৌঁছে বুদ্ধ ৮০ বছর বয়সে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধ পূর্ণিমার তৃতীয় স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ।
বুদ্ধ পূর্ণিমা মানবজাতির এক অনন্যসাধারণ মহাতিথি। এই পূর্ণিমার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সত্য-সুন্দরে নিবেদিত থেকে দুঃখ জয়ের সর্বোৎকৃষ্ট পথ নির্দেশক। ‘সকল প্রকার পাপময় কাজ থেকে বিরতি (শীল তথা সদাচার), কুশল কর্মের পরিপূর্ণতা (প্রজ্ঞা) ও স্বীয় চিত্তের বিশুদ্ধিতা আনয়ন (সমাধি) হচ্ছে বুদ্ধগণের অনুশাসন’— গৌতম বুদ্ধের এই বাণীর আলোকে আমাদের সবার জীবন উজ্জীবিত হোক। বুদ্ধ পূর্ণিমা স্মরণে, বরণে ও উদ্যাপনে আমাদের যাবতীয় উদ্যোগ স্বীয় দুঃখ মুক্তি এবং বিশ্বশান্তি কামনায় নিবেদিত থাকুক। বস্তুত বৌদ্ধ ধর্ম কর্মবাদী ধর্ম। গৌতম বুদ্ধ ছিলেন বৌদ্ধদের ‘শাস্তা’ বা শিক্ষক/পথপ্রদর্শক, সৃষ্টিকর্তা বা প্রভু নন। আমি তোমাকে মুক্ত করব, বুদ্ধ এ কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, জগতে কর্মই সব। মানুষ তার কর্ম অনুসারে ফল ভোগ করবে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং খারাপ কাজের জন্য খারাপ ফল পাবে। কর্মানুসারে মানুষ অল্প আয়ু, দীর্ঘ আয়ু, জটিল ব্যাধিগ্রস্থ, নিরোগ, বিশ্রী-সুশ্রী, সুখী-দুঃখী, উঁচু-নিচু, জ্ঞানী-মূর্খ ইত্যাদি ফল ভোগ করে। মানুষ কর্মের অধীন। বিশ্বের অপরাপর ধর্মগুলোতেও ভালো কাজের কথা বলা হয়েছে। তাই আসুন, আমরা সকল পাপকাজ থেকে বিরত থাকি। যাতে দেশ, জাতি তথা সকল প্রাণীর মঙ্গল হয়। আমাদের ইচ্ছা যখন সেই মূল মঙ্গল ইচ্ছার সঙ্গে সংগত হয়, তখন তারও সমস্ত ক্রিয়া স্বাভাবিক হয়। অর্থাৎ তার সমস্ত কাজকে কোনো প্রবৃত্তির তাড়নার দ্বারা ঘটায় না অহংকার তাকে ঠেলা দেয় না, লোকসমাজের অনুকরণ তাকে সৃষ্টি করে না, লোকের খ্যাতিই তাকে কোনোরকমে জীবিত করে রাখে না, সাম্প্রদায়িক দলবদ্ধতার উৎসাহ তাকে শক্তি জোগায় না, নিন্দা তাকে আঘাত করে না, উৎপীড়ন তাকে বাধা দেয় না, উপকরণের দৈন্য তাকে নিরন্ত করে না। বৌদ্ধধর্ম সাম্য, মানবতা ও শান্তিধর্ম ও ধর্মদর্শনের মৌলিক আদর্শই হলো শান্তি ও সম্প্রীতির চর্চা। সকল জীবসত্ত্বার হিত ও কল্যাণই মৌল শিক্ষা। বর্তমান শতাব্দীতে যে বিষয়টা জরুরি তা হলো— যেকোনো বৌদ্ধ প্রধান দেশে কিংবা অন্যান্য দেশে বর্তমান সমসাময়িক সমস্যা সমাধানে তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে; এমনকি রাজনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বজনীন চিন্তা-দর্শন কতটুকু ফলদায়ক তা প্রয়োগ করে দেখা উচিত। সবিশেষ উল্লেখ্য, অতীতে সম্রাট অশোক রাজ্য শাসনে বুদ্ধের নীতি-আদর্শ প্রয়োগ করে রক্তপাতহীনভাবে রাজ্য বিস্তারে যেমন সক্ষম হয়েছিলেন তেমনি প্রজাদের প্রভূত কল্যাণ সাধন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই বিশ্বের শোষিত-অত্যাচারিত-শৃঙ্খলিত জনগণ একবিংশ শতাব্দীতে অশোকের মতো একজন প্রকৃত জনদরদি রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব প্রত্যাশা করে। কাজেই বিশ্বসভ্যতায় মানবতার প্রথম প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধ এবং মানবতা সতত প্রকাশমান বৌদ্ধধর্মে। বৌদ্ধধর্ম যে পরিপূর্ণ মানবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তির পথ দেখিয়েছে তা চিরন্তন ও শাশ্বত। বিশেষত নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবগোষ্ঠী তথা প্রাণীসমূহের কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় গৌতম বুদ্ধের ধর্ম দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বে শান্তি স্থাপন হোক। সবাইকে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
লেখক: এমফিল গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। আবাসিক: আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা। ইমেইল: [email protected]
