পুলিশ হেফাজতে বৃদ্ধকে নির্যাতনের অভিযোগে ওসির বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ২৭ মে ২০২১, ১১:২১ পিএম

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দীপক কুমার দাসের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সাইফুদ্দিন প্রামানিক (৭০) নামে এক বৃদ্ধ সিরাজগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে মামলা করেন।

সাইফুদ্দিন প্রামানিক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের বেতবাড়ী গ্রামের মৃত মোতালেব প্রামানিকের ছেলে।

এ বিষয়ে মামলার বাদী সাইফুদ্দিন প্রামানিক জানান, গত ১০ মাস আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের বেতবাড়ী গ্রামে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ওসি দীপক কুমার দাস তাদের থানায় দেখা করতে বলেন। রাত হয়ে যাওয়ায় ওই দিন তারা থানায় আসতে পারেননি। এতে ওসি দীপক কুমার দাস তাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। এরপর তাদের ধরতে অভিযানের নামে পুলিশ পুরো গ্রাম তছনছ করে সবাইকে হয়রানি করে।

তার অভিযোগ, পুলিশের এ হয়রানি থেকে বাঁচতে শুরু হয় ‘অর্থ বাণিজ্য’। চাহিদা অনুযায়ী পুলিশকে টাকা না দিলেই বেতবাড়ী গ্রামে অভিযানের নামে রাতে বিভিন্ন বাড়িতে প্রবেশ করে ভাঙচুর, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ছাড়া একাধিক ব্যক্তিকে মামলা ছাড়াই আটক করে থানায় নিয়ে ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এরপর মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, এ নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রামবাসী সংবাদ সম্মেলন করে সিরাজগঞ্জের সাংবাদিকদের কাছে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশনে এ সংক্রান্ত সংবাদও প্রকাশিত হয়। এতে ওসি দীপক কুমার দাস আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন ও তাদের নামে নতুন নতুন মামলা দিয়ে তাদের জেলহাজতে পাঠাতে থাকেন।

এ বিষয়ে বাদী সাইফুদ্দিন প্রামানিক বলেন, আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। কিন্তু আমি সাংবাদিকদের কাছে পুলিশি হয়রানির কথা বলেছি। এটাই আমার অপরাধ। এরই জের ধরে গত ২৪ মে রাতে উল্লাপাড়া থানার চার-পাঁচজন সাদা পোশাকের পুলিশ এসে আমাকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। আমি শ্বাসকষ্টের রোগী। তারপরও দুই এসআই আমার হাত ধরে রাখে আর ওসি দীপক কুমার দাস আমাকে ব্যাপক মারধর করে। ওসিকে আমি বলি, ‘আমি আপনার বাবার বয়সী, আমাকে আর মারবেন না’। তিনি কোন কথা না শুনে এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে এমন করে মারধর করে যে, এতে আমি চরম অসুস্থ হয়ে পরি।

তার আরো অভিযোগ, পরে আমাকে ওই রাতেই উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা করায়। সেখানে ডাক্তাররা পর্যন্ত বলে, ‘কোনো মানুষ এই বৃদ্ধ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? ওসি মানুষ না অন্য কিছু’। ওসির এই নির্যাতনে আমার দু’হাতের তালু, মাথায়, ডান হাতে, গলার পেছনে, তলপেটে, পিঠে ও দুই কানসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। এরপর ২৫ মে চাঁদাবাজি মামলা দিয়ে আমাকে সিরাজগঞ্জ আদালতে চালান করে দেয়। আদালত আমার অবস্থা দেখে ও আমার জবানবন্দি শুনে আমাকে জামিন দেন। সেই সঙ্গে আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে চিকিৎসার জন্য সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করতে নির্দেশ দেন। আমি একটু সুস্থ হলে হাসপাতাল থেকে সার্টিফিকেট তুলে ২৭ মে বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার আমলি আদালতে হাজির হয়ে ওসির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করি।

তিনি আরো বলেন, আমি এই ওসির উপযুক্ত শাস্তি ও বিচার চাই।

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোরশেদুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার ঘোষ জানান, বাদীর দায়ের করা মামলাটি বৃহস্পতিবার বিজ্ঞ আমলি আদালতে উপস্থাপনের পর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসাদুজ্জামান মামলাটি আমলে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাদীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের রেজিস্টার্ড চিকিৎসককে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া বাদীর পক্ষের আইনজীবী পৃথক দরখাস্তে ঘটনার জুডিশিয়াল তদন্ত দাবি করায় তার বক্তব্য ও দাখিলকৃত কাগজ পর্যালোচনায় অভিযোগটি জুডিশিয়াল তদন্তের জন্য গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে আদালত নিজে তদন্ত করবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে উল্লাপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দীপক কুমার দাস বলেন, সাইফুদ্দিন প্রামানিকের বিরুদ্ধে অনেক আগের একটা মামলা ছিল। তাকে সেই মামলাতেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আমি কিংবা আমার কোন পুলিশ তাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেনি। আদালত তদন্ত করলে সঠিক ঘটনা বের হয়ে আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত