মোবাইল গেমসের ভয়াবহ আসক্তিতে শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২১, ১২:১৪ এএম

বেশ কিছুদিন ধরেই দরিদ্র ভ্যানচালক বাবা সাইদ ফকিরের কাছে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার বায়না ধরে সাঁথিয়ার নন্দনপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের কিশোর আরিফ (১৬)। কিন্তু অভাবের সংসারে ছেলের বায়না মেটাতে পারেননি সাইদ ফকির। গত সোমবার দুপুরে বাড়িতে কেউ না থাকায় ি নিজেদের ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে আরিফ।

স্বজনরা জানান, মোবাইল গেমসে আসক্তির কারণে ফোনের জন্য জেদ করছিল সে। গেম খেলার নেশা এতটাই তীব্র যে রাগে-ক্ষোভে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেনি সে। আরিফের এমন কান্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পাবনার স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে।

স্থানীয়রা জানান, বৈশি^ক মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের বেশির ভাগ সময় মুঠোফোনে ভিডিও গেমসে আসক্ত হয়ে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসের অজুহাতে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও অভিভাবকদের চাপ দিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে নিয়েছে। গ্রামগঞ্জের কিশোর-তরুণদের মাঝে এসব গেমস-আসক্তি ‘মহামারী’ আকার ধারণ করেছে।

সরেজমিন পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পাড়া-মহল্লায় দেখা যায়, কিশোর-তরুণরা রাস্তার মোড়ে, গাছের নিচে, খোলা জায়গায়, স্কুলমাঠে, জুটি বেঁধে বসে ফোর্টনাইট, তিন পাত্তি, লুডু, জান্ডিমুন্ডা ফ্রি ফায়ার-পাবজি গেমসগুলো খেলছে। যে স্থানে ওয়াইফাই ইন্টারনেট কানেকশন আছে, সেখানে জটলা করে ৩০-৪০ জনকেও একসঙ্গে বসে গেমস খেলতে দেখা যায়। অনেকে আবার মোবাইলে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।

কয়েক কিশোরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমসের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই গেমসে যারা বেশি পারদর্শী তারা আবার ডায়মন্ড পয়েন্ট বিক্রির ব্যবসা করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক শিক্ষার্থী জানায়, ফ্রি ফায়ার গেমস প্রথমে তাদের কাছে ভালো লাগত না। কিছুদিন বন্ধুদের খেলা দেখে তারা আসক্ত হয়ে পড়েছে। এখন গেমস না খেললে তাদের অস্বস্তি লাগে।

এ বিষয়ে সাঁথিয়া সোয়াইব কেব্্ল নেটওয়ার্কের পরিচালক কাবিল হোসেন বলেন, এক বছরে আমার ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে কয়েক গুণ। বছরখানেক আগে হাতে গোনা কয়েকজন নেট কানেকশন নিত আর এখন প্রতিটি পাড়ায় ও ঘরে ঘরে সংযোগ দিতে হচ্ছে। নেট সংযোগ দিতেই তার হিমশিম অবস্থা।

শিক্ষার্থীদের এমন প্রবণতায় অভিভাবক ও শিক্ষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সাঁথিয়ার কলেজশিক্ষক আব্দুদ দাউয়ান বলেন, ‘করোনা মহামারীর আগে যে সময়ে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ ও খেলার মাঠে ক্রীড়াচর্চায় ব্যস্ত থাকত, এখন সে সময়টা তারা মোবাইলে গেমস খেলে কাটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব গেমস নৃশংসতা, কুরুচি ও অশ্লীলতায় ভরা। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এসব বিদেশি গেমস থেকে নিজেদের ছেলেমেয়েকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ বলেন, মোবাইল ফোনে গেমস আসক্তির বিষয়টি উদ্বেগজনক। শিশু-কিশোরদের এ প্রবণতা ঠেকাতে অভিভাবকদের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও তাদের সচেতন করতে কাজ শুরু করেছেন। মানুষকে সচেতন করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও এসব গেমসের কুফল নিয়ে আলোচনা করতে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত