স্বপ্নের সেতু বেয়ে বিলেতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে কাঙ্ক্ষিত বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন। জীবন চলছিল স্বপ্নের মতোই। কিন্তু বাবার মৃত্যু ঘুরিয়ে দিয়েছে সেই পথ। তবে সততা, পরিশ্রম ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নিজ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে বসেই গড়ে তুলেছেন “রাও ফার্ম ফ্রেশ” নামের এগ্রো ফার্ম।
সেই ফার্ম থেকেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন সেলিম সরকার। প্রতি মাসেই আয় করছেন কমপক্ষে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা। সেলিম সরকার এখন এলাকার সফল উদ্যোক্তা।
সেলিম দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের কাতলমারি গ্রামের মৃত আ. মান্নানের ছেলে।
কাতলমারি গ্রামে প্রায় ১৩ একর জমির উপর গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন প্রজাতির আম, ড্রাগন, মাল্টার বাগান, নার্সারি, গরু, গাড়ল ও ভেড়ার খামার। এছাড়াও রয়েছে চিনিগুঁড়া ধান ও সরিষার আবাদ। সেলিমের ফার্মে এখন কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ জনের।
সেলিম সরকার জানান, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা শেষে সেখানে কাঙ্ক্ষিত চাকরি নিয়ে বসবাস করার। সেই লক্ষ্যে ২০০৭ সালে ঢাকার সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.বি.এ শেষ করে ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। লন্ডনের বের্ডফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) কোম্পানিতে মাসিক তিন লাখ টাকা বেতনে অ্যাকাউনট্যান্ট পদে চাকরিতে যোগদান করেন। বিদেশে যখন স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন ঠিক তখনই ২০১২ সালে বাবা মৃত্যুবরণ করেন। চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে।
এরপর মায়ের অনিচ্ছায় আর ফেরা হয় না বিদেশে। ঠিক করেন গ্রামেই এমন কিছু করবেন যা দিয়ে বিদেশের চাইতে বেশি কিছু আয় করা সম্ভব হবে।
২০১৪ সালে প্রথমে শুরু করেন গরুর ফার্ম দিয়ে। এর কিছুদিন পর নিজেদের ১০ একর জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে হাঁড়িভাঙা, আম্রপালি, মিশ্রিভোগ, বারি-৪, ফজলিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৩ হাজার গাছের আমের বাগান করেন।
এরপর ড্রাগন, মাল্টা বাগান করেন। ২০১৭ সালে আম বাগানে প্রথম ফলন হয়। প্রথমবার ফলন হওয়া পরিমাণে খুব কম। সেলিম সিদ্ধান্ত নেন পাইকারি ফল ব্যবসায়ীদের কাছে পুরো বাগানের আম বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু পাইকারি ফল ব্যবসায়ীরা পুরো বাগানের আম সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা দর করেন। এতে হতাশ হয়ে যান সেলিম।

বাগান নিয়ে ঠিক কি করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না সেলিম। কৌতূহল বশত বাগানে গিয়ে ফেসবুকে লাইভ করা শুরু করলেন সেলিম। কিছুদিন লাইভ করার পর ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি আম ক্রয়ের ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। যে আম পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাত্র ৫ হাজার টাকা দাম করেছিল সেই আম সেলিম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করলেন।
এরপর সেলিম সিদ্ধান্ত নিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সরাসরি তার ফার্মে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করবেন। পরের বছর ২০১৮ সালে ১৮ লাখ টাকার আম, ড্রাগন এবং মাল্টা বিক্রি করেন।
সর্বশেষ গত বছর ৫০ লাখ টাকার আমসহ অন্যান্য ফল বিক্রি করেন। সেলিম জানান, এ বছর তিনি এক কোটি টাকার আমসহ অন্যান্য ফল বিক্রির টার্গেট নিয়েছেন।
আমের বাগানে কর্মরত শ্রমিক মো. সাজু জানান, সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত আমসহ অন্যান্য ফল উৎপাদন করা হয়। তাদের বাগানের উৎপাদন এবং সফলতায় আশপাশের অন্যান্য ব্যক্তি বাগান করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এ ফার্মের ফলে সেখানে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে।
গত শুক্রবার সরেজমিনে সেলিমের রাও ফার্ম ফ্রেশ এ যান এ প্রতিবেদক। সেলিম জানান, তার বিক্রীত ফল খেয়ে ক্রেতারা ওই সব ফলের গাছেরও খোঁজ করেন। সেই তাগিদ থেকে তিনি ২০১৮ সালে নার্সারিও করেন।
গত বছর তিনি ৫ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছের চারা বিক্রি করেছেন। গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশু বিক্রি করে গত বছর আয় করেছেন প্রায় ৫ লাখ টাকা। এ বছর কোরবানি ঈদে ৪০ টি গরু বিক্রির টার্গেট করেছেন সেলিম।
গরুর খামারে কর্মচারী শ্রী দিলীপ কুমার জানান, সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে গরুর লালন-পালন করা হচ্ছে।
কোরবানিকে টার্গেট নিয়ে এসব উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে গরুকে মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে।
এছাড়াও রাও ফার্ম ফ্রেশ ঘুরে দেখা গেছে, গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে তারা সরিষা ভাঙার ঘানি, চিনি গুঁড়া চালের আবাদ, সরিষার মধুও উৎপাদন করছেন।
রাও ফার্ম ফ্রেশের অনলাইন মার্কেটিং ম্যানেজার মো. ইমন জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের ফলে দ্রুত সফলতা পেয়েছেন তারা।
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু দেশেই নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার পাচ্ছেন।
বর্তমানে রাও ফার্ম ফ্রেশের ফেসবুক ফলোয়ার ১ লাখ ৫৫ হাজার এবং ইউটিউবের সাবসক্রাইবার ১৬ হাজার ৫০০ জন।
তাই রাও ফার্ম ফ্রেশ শুধু উৎপাদিত ফসল বিক্রির পাশাপাশি ফেসবুক এবং ইউটিউব থেকেও আয় করছে।
মধ্যপাড়া কলেজের আইসিটি বিভাগের প্রভাষক মো. জাকারিয়া জানান, সেলিমের রাও ফার্ম ফ্রেশ এর সফলতায় এলাকার শিক্ষিত যুবকেরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তিনিও এ বছর আমের বাগান ইজারা নিয়ে সফলতা পেয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সততা এবং ইচ্ছে থাকলেই দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সফলতা অর্জন করা যায় তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ রাও ফার্ম ফ্রেশ। কৃষি বিভাগ রাও ফার্ম ফ্রেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে চলেছে।
রাও ফার্ম ফ্রেশের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম সরকার জানান, সততাই তার সফলতার মূল মন্ত্র। তার প্রায় সব গ্রাহকই অনলাইনের মাধ্যমের। প্রতিনিয়ত অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকেরা যেভাবে প্রতারিত হচ্ছে সে জায়গায় রাও ফার্ম ফ্রেশ শতভাগ সততার মাধ্যমে গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহ করে চলেছে। ফলে গ্রাহকরাই এখন রাও ফার্ম ফ্রেশের মূল প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
