বিশ্বব্যাপী ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম সুতার তৈরি পোশাকের চাহিদা এখন তুঙ্গে। পোশাক খাতের বৈশ্বিক বাজারের ৭৪ শতাংশ এখন ম্যানমেইডের দখলে। অথচ বাংলাদেশ এই খাত থেকে আয় করে মাত্র ৩০-৩২ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম সুতার বিপ্লব ঘটলেও তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ, কারিগরি সক্ষমতার অভাব ও মালিকদের উদাসীনতায় এই খাতে তেমন ভালো করতে পারছে না বাংলাদেশ। এজন্য প্রতিযোগিতায়ও ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন রপ্তানিকারকরা। এই অবস্থায় বিশ্ববাজারের পোশাক রপ্তানিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে ম্যানমেইড কাপড়ে তৈরি পোশাককেই একমাত্র বিকল্প দেখছেন কারখানা মালিকরা। এজন্য এই খাতে রপ্তানিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা চাইছে পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ। তাদের দাবি, এমনটি হলে বছরে ২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে আমরা নিজেদের স্বার্থেই কেবল প্রণোদনা চাচ্ছি। আমরা হিসাব করে দেখেছি, সরকার থেকে এই সুবিধাটা পেলে আগামী অর্থবছরে ২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। এতে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। প্রণোদনা চাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এই খাতের ক্রেতাদের অন্য দেশ থেকে ভাগিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর খাতটি প্রতিষ্ঠিত হলে প্রণোদনার আর প্রয়োজন পড়বে না।’
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী দেশে ম্যানমেইড ফাইবারের মোট বাজার ৮ বিলিয়ন ডলারের। এই খাতে যদি ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয় তাহলে বছরে সরকারকে গুনতে হবে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর বিনিময়ে দেশে বাড়তি রপ্তানি আয় আসবে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিজিএমইএর এমন চাওয়াকে আকশ কুসুম কল্পনা বলছে অনেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, এককভাবে কোনো খাতকে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দিতে গেলে এক গার্মেন্টসেরই অন্য খাতগুলো প্রণোদনা চেয়ে বসবে। তবে রপ্তানি বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে যদি প্রণোদনা ভালো ভূমিকা রাখে সেক্ষেত্রে বিষয়টি দেখবে সরকার।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে বিজিএমইএর এক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সরকারের কাছে বেশি চাইলে সরকার আগ্রহ সহকারে বিষয়টি দেখবে। এ ছাড়া যতটুকু প্রণোদনা প্রয়োজন সেই পরিমাণ চাইলে সরকার তার থেকেও বেশি চাইবে। সে জন্যই বাড়তি হারে প্রণোদনা চাওয়া হচ্ছে।’ এই খাতকে এগিয়ে নিতে ২-৩ শতাংশ প্রণোদনা পেলেও অনেক কাজে লাগবে বলে জানান ওই নেতা।
এদিকে ম্যানমেইড সুতার কাপর রপ্তানিতে প্রণোদনা দিলে দেশের স্পিনিং ও নিটিং অর্থাৎ টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তাদের ভেটো দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের যতগুলো স্পিনিং মিল আছে সেগুলোর অধিকাংশই কটনবেইজ। টেক্সটাইল মিলগুলোরও একই অবস্থা। এ ছাড়া নতুন করে ম্যানমেইডের কিছু টেক্সটাইল কারখানা ইতিমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। বেশ কিছু স্থাপনের পথে। এমতাবস্থায় টেক্সটাইল খাত থেকে প্রণোদনার দাবি জোরালো হওয়ার আশঙ্কা করছে খোদ বিজিএমইএ।
ফারুক হাসান বলেন, ‘এক্ষেত্রে সরকার একটা সমাধানে যেতে পারে। প্রথম তিন বছর ম্যানমেইডের পোশাক রপ্তানি করলেই প্রণোদনা এমন নিয়ম চালু করতে পারে। এরপর দুই বছরের জন্য শর্ত দিতে পারে যে অবশ্যই দেশের টেক্সটাইল মিলে কাপড় বুনন হতে হবে। পাঁচ বছর পরে কেবলমাত্র দেশে উৎপাদিত সুতা ও কাপড় দিয়ে প্রস্তুত করা পণ্যকেই প্রণোদনার উপযুক্ত করা যেতে পারে। এভাবে একটি নীতিমালা করে প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে। তখন টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজার ধরতে নতুন কারখানা স্থাপন করতে চাইবেন। এভাবে নিট কাপড়ের মতো আমাদের ম্যানমেইডের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজও পাঁচ বছর পরে শক্তিশালী হবে।’
