চারদিকে কর্ম ব্যস্ততা। প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা থেকে শ্রমিক সবাই সমান মনোযোগী। নির্মাণ শ্রমিকেরা কেউ একের পর এক ইটের গাঁথুনি দিচ্ছেন, কেউবা রং করছেন, কেউ আবার পানির পাইপ টানছেন।
৩০০টি ঘর নির্মাণের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে ১৫৮টি। সবুজ পাহাড়ের বুকে সারি সারি ঘর, প্রতিটি ঘরে সাদা ও লাল-সবুজের মিথস্ক্রিয়া। এ যেন বাংলাদেশের গর্বের লাল-সবুজের মিলিত প্রয়াস। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোন পর্যটন স্পট।
এটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহিতে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প।
এ প্রকল্পে পানি-বিদ্যুৎ সুবিধা, বিদ্যালয়, নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য কমিউনিটি হল থেকে শুরু করে একটি শহরে যেমন সুযোগ-সুবিধা থাকে তার সবই থাকবে। সরকারের প্রতিটি বিভাগ এখানে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এই কর্মযজ্ঞ তত্ত্বাবধান করছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। সময়-সময়ে জেলা প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা আসছেন তদারকি করতে। সবার সঙ্গে সমন্বয় করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কথা বলারও সময় নেই তার, কারণ ২০ তারিখ প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন।
রাতে নজরুল ইসলাম বাসার ফেরার পথে গাড়িতে বসেই জানালেন এই প্রকল্পের বিস্তারিত।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘গ্রাম হবে শহর’ ভিশনকে চিন্তা করেই আমরা আশ্রয়ণ প্রকল্পটি করেছি। তবে এখানে কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকছে যা সাধারণত এমন প্রকল্পে থাকে না।
আরও বলেন, প্রথমে ৩০ একর জায়গা অবৈধ দখল থেকে উদ্ধার করেছি, এবং এই মাজদিহি জায়গাটি প্রধান সড়ক থেকে ১ কিলোমিটার ভেতরে। ৩টি রাস্তা নির্মাণ হয়েছে। আমরা ৩০ একর জায়গায় ৩টি ব্লকে ১৫০০ মানুষের জন্য ৩০০টি ঘর নির্মাণ করছি। এখানে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হবে। নারীরা যেন প্রশিক্ষণ নিতে পারেন তাই একটি মাল্টিপারপাস কমিউনিটি হল নির্মাণ করা হবে।
‘মুজিববর্ষ’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে, মন্দির-মসজিদ হবে। ফলমুল ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ৫ হাজার গাছ লাগানো হচ্ছে। এক কথায় যত ধরনের নাগরিক সুবিধা শহরের মানুষ পায় তা এখানে করা হবে। ছোট হাসপাতাল বা কমিউনিটি ক্লিনিকও হবে। অর্থাৎ কিছুই বাদ যাবে না— জানালেন এ কর্মকর্তা।
সরেজমিনে মাজদিহি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, শত শত বৃক্ষরোপণ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্দীপ্ত তারুণ্য।
সংগঠনটির সমন্বয়ক হৃদয় শুভ জানান, আমরা ইতিমধ্যে এখানে প্রায় ২ হাজার গাছ রোপণ করেছি। গাছগুলো এই প্রকল্পের জন্য স্থানীয় বন বিভাগ, কৃষি বিভাগ, উপজেলা কর্মকর্তার অফিস এবং আমাদের অর্থে কেনা। সবকিছু মিলে এখানে একটি আদর্শ গ্রাম হতে যাচ্ছে।
বিনা মূল্যে এখানে আশ্রয় পেয়ে খুশি গৃহহীনেরা। তেমনই একজন মনতাজ মিয়া। তিনি বলেন, আগে কোন ঠিকানা ছিল না, এখন একটা ঠিকানা হচ্ছে। বাচ্চাদের নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। রাস্তার পাশে ছোট একটি বেড়ার ঘর বানিয়ে থাকতাম, অনেক কষ্ট হতো। বৃষ্টির সময়, বৃষ্টির পানি ঢুকে যেতো। এখন আমি আর পরিবার খুশি, পাকা ঘরে থাকবো, নিজের ঘরে থাকবো। সরকারের এ ঋণ শোধ করতে পারবো না।
জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বপ্ন দেখেন— কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না। সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে আমরা কাজ করছি। প্রতিটির জন্য ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা বাজেট ধরে প্রশাসন ঘরগুলো নির্মাণ করছে।
