শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে ‘তুলে দেওয়ার’ অভিযোগ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে

আপডেট : ২২ জুন ২০২১, ০৯:২২ পিএম

পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে অধ্যক্ষের সামনেই শ্রেণিকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে মারপিট করেছেন ছাত্রলীগ নেতারা। এ ঘটনায় রবিবার পাবনা সদর থানায় ওই শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়েরের জন্য এজাহার জমা দিয়েছেন।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তবে শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও মারধরের বিষয়ে অবগত নন বলে দাবি অধ্যক্ষের।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ১৫ জুন পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আলাউদ্দিন সরদার আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের ডেকে পাঠান। ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম স্বাধীন (২২) স্যারের কথায় ক্যম্পাসে যান। শ্রেণি কক্ষে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক আলাউদ্দিন সরদারের আলোচনার সময় কলেজ ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুমন হোসেনের নেতৃত্বে কলেজ কমিটির সহ-সভাপতি রাজিব হোসেন আলিফ, সদ্যবিলুপ্ত সদর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক সাব্বির আহমেদ জয়, জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি তপু রায়হান, মইনুল হাসান মুন্নাসহ আট-নয়জন বহিরাগত যুবক সশস্ত্র অবস্থায় শ্রেণিকক্ষ থেকে জোরপূর্বক বের করে নিয়ে পাশের একটি কক্ষে মারধর করতে থাকে। এ সময় তারা স্বাধীনের ব্যবহৃত ফোনটিও ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এজাহারে আরো বলা হয়েছে, শিক্ষক আলাউদ্দিন সরদার বিষয়টি তাৎক্ষণিক কলেজ অধ্যক্ষ বাহেজ উদ্দিনকে অবহিত করলে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন। তবে তিনি স্বাধীনকে রক্ষায় কোনো উদ্যোগ না নিয়ে সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাসে কিছু না করে বাইরে নিয়ে পেটাতে বলেন।  পরে সন্ত্রাসীরা স্বাধীনকে পার্শ্ববর্তী জুবলী ট্যাংক মার্কেটের ছাদে নিয়ে মারধর শেষে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসা শেষে বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে বিশ্রামে আছেন।

ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম স্বাধীন বলেন, গত বছর গরীব ও অসহায় শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত উপবৃত্তি দেওয়া হয়। বিষয়টি সাধারণ শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে, ওয়েবসাইটে কোনো নোটিশ না দিয়েই অধ্যক্ষ মহোদয় এক ঘনিষ্ঠজনের মাধ্যমে একটি তালিকা তৈরি করে এ টাকা বিতরণ করেন। আমরা অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষ স্যার আমাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব পড়বে বলেও হুমকি দেন।

যার প্রেক্ষিতে স্মাকলিপিতে স্বাক্ষর করা এইচ এম সাব্বির নামের এক সহপাঠিকেও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা উলঙ্গ করে নির্যাতন ও ভিডিও ধারণ করে। কলেজ করোনায় বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসে যাইনি। ঘটনার দিন স্যার ডেকে পাঠালে ক্যম্পাসে যাই। এ খবর পেয়ে তারা স্যারের সামনেই মারধোর শুরু করে।

স্বাধীন আরো বলেন, অধ্যক্ষ স্যার এসে আমাকে রক্ষায় কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বাইরে নিয়ে পেটাতে বলেন। আমি বারবার আকুতি জানালেও তিনি বিষয়টি কর্ণপাত করেন নি। একপর্যায়ে জীবন রক্ষার্থে আমি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা আমাকে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে ব্যাপক মারধর করে।

এইচ এম সাব্বিরকে নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কলেজ ক্যম্পাসের আশেপাশে এই সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েকটি টর্চার সেল আছে। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নেমে আসে নির্যাতন। এ টর্চার সেলে অনেককেই মারধর করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক আলাউদ্দিন সরদার বলেন, আমি শিক্ষার্থীদের ডেকেছিলাম। শ্রেণিকক্ষে কথা বলার সময় অতর্কিত কয়েকজন যুবক এসে স্বাধীনকে ধরে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যায়। ঝামেলা আঁচ করতে পেরে তাৎক্ষণিক বিষয়টি অধ্যক্ষ স্যারকে অবহিত করি। স্যার এসে কী করেছেন আমার জানা নেই।

অভিযুক্ত কলেজ ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুমন হোসেন বলেন, শরিফুল ইসলাম স্বাধীন কলেজের একটি মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জেরে তাকে কিছু জুনিয়র শিক্ষার্থী পিটিয়েছে বলে শুনেছি। তবে আমি এ ঘটনায় সম্পৃক্ত নই।

সন্ত্রাসীদের হাতে শিক্ষার্থীকে তুলে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে অধ্যক্ষ বাহেজ উদ্দিন বলেন, কলেজে ঝামেলার খবর শুনে আমি ঘটনাস্থলে যাই। সে সময় স্বাধীনকে মারপিটের বিষয়ে জানতে চাইলে সে কিছু বলেনি। ওই শিক্ষার্থীরা পূর্বপরিচিত এবং বিষয়টি তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। তারা স্বেচ্ছায় এক সঙ্গে ক্যম্পাস থেকে বেরিয়ে গেছে। কলেজ ক্যম্পাসে মারপিটের কোনো ঘটনা ঘটেনি। উপবৃত্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও সত্য নয়।

পাবনার পুলিশ সুপার মোহা. মহিবুল ইসলাম খান বলেন, বিষয়টি আমি অবহিত, অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ কাজ করছেন। অভিযুক্ত প্রমাণিত হলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত