রাজধানীর মগবাজার ওয়ারলেস গেট এলাকায় রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কমপক্ষে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে দুই শতাধিক মানুষের বেশি। এদের মধ্যে কমপক্ষে ১৭ জনের আশঙ্কাজনক। নিহত ৭ জনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, মগবাজারের বাসিন্দা জান্নাত (৩০), তার ৯ মাস বয়সী মেয়ে সুবহানা ও স্বপন (৩৫) নামে একজন। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম ৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃতের সংখ্যার আরও বাড়তে পারে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ৭৯ বড় মগবাজার ওয়্যারলেস গেট সংলগ্নে এলাকায় আড়ংয়ের শো-রুমের উল্টোপাশে একটি তিন তলা ভবনের নিচ তলায় বিস্ফোরণ হয়। ওই ভবনটিতে ‘শর্মা হাউস’, বেঙ্গল মিট, গ্র্যান্ড সুইটসসহ কয়েকটি দোকান ছিল। দোতলায় ছিল সিঙ্গার ইলেকট্রনিকস পণ্যের গোডাউন। তিন তলায় থাকতেন বাড়ির মালিক ও কয়েকজন ভাড়াটিয়া। ভবনের নিচতলায় হওয়া বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর থেকে অন্তত ৩০-৪০ গজ দূরের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার উল্টো পাশে আড়ংয়ের শোরুমের ৬ তলা পর্যন্ত জানালার কাঁচ, কার্নিস ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশাল সেন্টার, রাশমনো হাসপাতালসহ কয়েকটি ভবন। বিস্ফোরণের সময় রাস্তা চলাচলরত ১৫-১৬টি বাস ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।ঘটনাস্থলে রাস্তায় ভাঙা কাঁচ, ইটের টুকরাসহ বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়।
জানা গেছে আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতাল ও ঢামেকে নিয়ে যায় পথচারী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। পরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটেও ভর্তি করা হয়েছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন এস এম আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ৩৬ জনকে এখানে আনা হয়েছে। তার মধ্যে দেড় বছরের শিশুসহ ৪ জন মারা গেছেন। তবে ঘটনাস্থল থেকেই তাদের মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। ’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে অন্তত ৫০ জনকে ভর্তি করা হয়। কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক বিপুল জ্যোতি কুণ্ড জানান, হাসপাতালে ৬০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন শিশুসহ দুইজন মারা গেছে। তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আদদ্বীন হাসপাতাল, রাশমনো হাসপাতাল, কাকরাইলের ইসলাম ব্যাংক হাসপাতাল ও সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন বলেন, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ১৩টি ইউনিট কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে আমরা ওই ভবনে এসি বিস্ফোরণ হওয়ার খবর পাই। পরে আবার অনেকে ফোন করে জানিয়েছেন, গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, সেখানে একটি ভবন প্রায় ধসে পড়েছে- এমন খবর পাওয়ার পর আমাদের সদস্যরা সেখানে গেছে। সেখানে কয়েকজন আটকা পড়ার খবরও পেয়েছি। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বিস্ফোরণ দগ্ধ ও আহত ইমরান হোসেন শুভর (২৫) খোঁজে শেখ হাসিনা বার্ন আসেন মা লিজা আক্তারসহ তার স্ত্রী ও ছোট বোন। হাসপাতালের বেডে প্রতিটি রোগী খুঁজতে খুঁজতে একপর্যায়ে নিজের স্বামীর খোঁজ পান স্ত্রী তামান্না। স্বামীর রক্তাক্ত চেহারা দেখেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘একবার আমারে যাইতে দাও ভিতরে, আমি একবার ওরে দেখুম। সারা জীবন এগুলা টিভিতে দেখছি, আল্লাহ আজ এগুলা আমাদের দেখাইলো ক্যান, ওরে একটু দেখুম আমি, একবার একটু দেখাও আমাকে।’
আহত ইমরানের ছোটবোন আইরিন জানান, ‘তাদের বাসা শান্তিনগর। ইমরান স্ত্রী নিয়ে মগবাজারে থাকতেন। ৩বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। তাদের কোনো সন্তান নেই। ২বছর ধরে ইমরান ওয়ারলেসে "ব্যাঙ্গল মিট" নামে মাংসের দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করছিল। সন্ধ্যায় লোক মারফত খবর পান মগবাজারে তাদের দোকানের পাশে বিস্ফোরণ হয়েছে। ইমরানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার ভাইকে চেনা যাচ্ছে না। পুরো শরীর দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। ওকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডাঃ সামন্ত লাল সেন জানান, রাত ১০ পর্যন্ত বার্ন ইনস্টিটিউটে ১৭জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ২জনকে মৃত অবস্থাতেই নেওয়া হয়। ৩ জন দগ্ধ রোগী। এদের ২জনকে আইসিইউতে ও একজনকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে। দগ্ধ ৩ জনেরই শরীরের ৯০ শতাংশ বার্ন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিরা সবাই আহত। তাদের শরীরে ভাঙা ও কাটা ছেড়া যখম রয়েছে। তাদেরকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাদের ভর্তি করা হয় তারা হলেন, রনি (২৭), জিয়াম (২৫), মাহবুব (৩০), অজ্ঞাত (২৫), লাভলু (৬০), সাজিদ (১৮), মিজান (৪২), ইকবাল (৫০), অজ্ঞাত (২৮), ইলিয়াস (২৬), রফিকুল (৩৫), সোহেল (২৬), জহির খান (২৬), সাজ্জাদ (৩৫), আবুল খায়ের (৩৫), সুভাষ (৫৮), কামাল (৪২), অজ্ঞাত (৩২), আসাদ (২৭), মোক্তার (৩৫) রতন (৩০), অজ্ঞাত (৫৫), অজ্ঞাত (৫০), অজ্ঞাত (২৫), শাহজাহান (৪৫), নয়ন (২২), মুসা (৫০), ফজল (২৫), মিজান (২৫), রাকিবুল (৩০), হৃদয় (৩০), অজ্ঞাত (৩০), ইকবাল (৩০), মামুন (৪০), মাসুদ (৫০), শাহিন (৬০), কামাল (৪২) আইয়ুব (২৫), তপন (৩৫), অজ্ঞাত (৫০), কালু (৩৫), শাহ আলম (৫০) ও নাহিদ (২৬)। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, ঢাকা মেডিকেলে ৩৮জনকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের মধ্যে শিশু ও নারী রয়েছে। তাদের সবার শরীরেই কাটা ছেড়া গুরুতর আঘাত রয়েছে।
শেখ হাসিনা বার্ন ইনিস্টিটিউটে আহত যাদের ভর্তি করা হয়ছে তারা হলেন, শাহ আলম, কালু, তপন, কামাল, শাহিন, কালু, মাসুদ, মামুন, ইকবাল, হৃদয়, রাকিবুল, জিহান, মুসা, নয়ন, শাহজাহান, আয়মান, রতন, মোক্তার, আসাদ, সুভাষ, খায়ের, জহিরখান, সোহেল, রাসেল, জাকির হোসেন, স্বপন, নয়ন, মোতালেব, আবুল কালাম, পইমল হোসেন, মোস্তাফিজ, নবী ও আজাদ।
রাত ১১ টার দিকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বপন (৩৫) নামে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ তানভির তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চিকিৎসাধীন অনস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ইনস্টিটিউটে ৩ জনের মৃত্যু হলো। নিহতের ছেলে মো. বিশাল জানান, ‘তারা মগবাজার চেয়ারম্যান গলিতে থাকেন। তার বাবা প্রাইভেটকার চালক। আহাজারি করে ছেলে বিশাল বলেন, ‘আমারতো আর কেউ নাই, আমিতো পুরা এতিম হইয়া গেলাম গা, আমার বাবা আমারে আর ফোন দিয়া কইবোনা বিশাল তুই বাসায় আয়, এত দেড়ি হয় ক্যা। তাড়াতাড়ি আয়।
এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেলে মগবাজারে বিস্ফোরণের ঘটনায় জান্নাত (৩০) নামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। তার আগে ঘটনাস্থলেই মারা যায় জান্নাতের ৯ মাস বয়সী মেয়ে সুবহানা। ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ ইন্সপেক্টর বাচ্চু মিয়া জানান, ঢামেকে ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জান্নাত মারা যায় রাত দশটার দিকে। নিহতর নারী স্বামীর নাম সুজন তারা মগবাজার এলাকায় থাকত।
সুজনের বন্ধু আলমগীর জানান, ঘটনার সময় তারা মগবাজার ওয়ারলেস শর্মা হাউসে রাতে খেতে যান। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে জান্নাতের ৯ মাসের শিশু সন্তান মারা যায়। আর জান্নাত মারা যায় ঢামেকে। এই ঘটনায় জান্নাতের ছোট ভাই রাব্বি ও গুরুতর আহত।
