প্রতিবাদ করায় পাইলটদের কর্তিত বেতন ফেরত দিচ্ছে না বিমান

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ০২:২৬ এএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্তন করা বেতন ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে সবার টাকা ফেরত দেওয়া হলেও পাইলটদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে পাইলটদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। পাইলটরা তাদের কর্তিত বেতনের সিদ্ধান্ত বাতিলপূর্বক স্বীকৃতি চাচ্ছেন। সম্প্রতি বিতর্কিত কয়েকজন পাইলটকে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদ করছে পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। আর এ কারণে পাইলটদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রতিবাদকারীদের চাকরিচ্যুত করারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যদিও কর্তৃপক্ষ পাইলটদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, নিয়মের মধ্যে থেকেই সবকিছু করা হচ্ছে। বিশৃঙ্খলা করলে কঠোরভাবে তাদের দমন করা হবে।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানের পাইলটদের বেতন আগে থেকেই দুনিয়ার সব এয়ারলাইনসের চেয়েই বেশি ছিল। এমনকি এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলটদের চেয়েও বিমানের পাইলটরা বেশি সুবিধাদি ভোগ করছেন। এখন করোনার সময়ে দেশজুড়ে মানুষের মাঝে হাহাকার অবস্থা। মানুষের কষ্টের শেষ নেই। ঠিক এমন সময়ে পাইলটদের বেতনভাতাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা কতটুকু যৌক্তিক। করোনার উপলক্ষে ব্যয় সংকোচন নীতি হিসেবে পাইলটসহ সব স্টাফেরই বেতনভাতাদি কমানো হয়েছিল। এখন আবার সেটা পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। পাইলটরা তো এমনিতেই একটা ভালো অবস্থানে আছেন। সেজন্য আপাতত তাদের নতুন সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়েছে। সামনের পরিস্থিতি ভালো হলে, করোনার তা-ব কমে গেলে আবার অন্যদের মতোই পাইলটদেরও কনসিডার করা হবে। এ নিয়ে এত অধৈর্য হওয়ার কী আছে।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত বছর করোনার সূচনাতেই ব্যয় সংকোচন নীতিতে পাইলটসহ সব কর্মীর বেতন কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দেশের স্বার্থে এটা সবাই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি এক পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। যা চলতি জুলাই মাস থেকেই কার্যকর করা হবে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একমাত্র পাইলট ছাড়া বাকি সব কর্মী সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ তাদের বেতন আগের মতো কর্তন করা হবে না। মূল ফ্রন্টলাইনার হিসেবে পাইলটদের এর বাইরে রাখায় বিমানজুড়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। খোদ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত বিমানে বৈষম্য তৈরি করবে।

অভিযোগ উঠেছে, বিমান ফাইন্যান্স বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে পাইলটদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিমানের বেশিরভাগ পাইলটকে চাকরিচ্যুত করে নতুন করে নিয়োগ করার হুমকি দিয়েছেন তারা। সম্প্রতি তাদের একক সিদ্ধান্তে বিমানে ছয় পাইলট নিয়োগ নিয়ে পাইলটরা আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিলেন। অথচ করোনার সময়ে বিমানের অনেক পাইলট বসে আছেন। তারপরও কেন এই নিয়োগ এ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে একাধিক পাইলট দেশ রূপান্তরকে জানান, অতীতের মতো এবারও এ নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। করোনা মহামারীকালে যেখানে বিমানের অধিকাংশ পাইলটকে বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া হচ্ছে, সেখানে তড়িঘড়ি করে চুক্তিভিত্তিক ছয় পাইলট নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজন চরম বিতর্কিত। এদের একজন সংগীতশিল্পী মিলার সাবেক স্বামী সানজেরী যিনি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় জেল খেটেছেন। আর এ কারণে নভো ও ইউএস-বাংলা থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। আতিক নামে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যিনি বছর তিনেক আগে বিমানে যোগদানের পর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অন্য এক আতিকুর রহমান বিমানের পরীক্ষায় পাসই করতে পারেননি। তাকেও শুধু মৌখিক পরীক্ষায় তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা জানিয়েছেন, বিমানের নিজস্ব ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফটের জন্য পাইলটদের দরকার ছিল। যাদের নেওয়া হয়েছে তারা ইতিমধ্যে নিজস্ব উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়েই এসেছে। এ করোনার সময় নতুন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাইলট তৈরি করাটাও বেশ দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদেরই নেওয়া হয়েছে। এতে বিমানের আর্থিক সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় তাদের বেতনভাতাদিও বিমানের চেয়েও কম। কাজেই এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

পাইলটদের অভিযোগ, বিমানে অসংখ্য ক্যাডেট পাইলট ও ফার্স্ট অফিসার রয়েছেন, যাদের কোনো ফ্লাইট নেই। তারা বসে বসে বেতনভাতা নিচ্ছেন। এদের মধ্য থেকে সিনিয়রদের প্রমোশন দিয়েই ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০ উড়োজাহাজের পাইলট নিয়োগ করা সম্ভব ছিল। এছাড়া বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ও বোয়িং ৭৩৭-এর অসংখ্য ফার্স্ট অফিসার আছেন তাদেরও প্রমোশন দিয়ে ড্যাশ-৮-এর পাইলট করা যেত। এরাও বর্তমানে ফ্লাইট না থাকায় বসে বসে বেতনভাতা নিচ্ছেন। তারপরও হঠাৎ নতুন পাইলট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিমানের প্রশাসন বিভাগের ডিজিএম পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটা দ্রুততম সময়ে হয়নি। এ বিষয়ে পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সঙ্গেও কোনো আলোচনা করা হয়নি। উল্টো বাপার পক্ষ থেকে এ নিয়োগে বাধা দেওয়ার কারণে তাদের বেতন কর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়নি। এর আগেও বিমানে পাইলট নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছিল মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। ওই নিয়োগের আগে বিমানের সর্বোচ্চ স্তর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স নির্ধারণে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করা হয়েছিল। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মোসাদ্দিক আহমেদের ভাতিজাসহ কমপক্ষে ৩০-৩২ জন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ভাতিজাকে নিয়োগ দিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এম মোসাদ্দিক আহমেদ নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করার ঘটনা দুদকে তদন্তাধীন। এবারের পাইলট নিয়োগ নিয়েও এরকম কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। তাছাড়া প্রয়োজন না থাকার পরও তড়িঘড়ি করে কেন নতুন পাইলট নিয়োগ করা হলো তা খুঁজে দেখা উচিত।

এদিকে বেতন কর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করায় পাইলটরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, এর আগেও পাইলটদের বেতন কর্তন নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে। বেতন ২৫-৫০ শতাংশ হারে কর্তনের সিদ্ধান্ত হলেও ভুল হিসাব দেখিয়ে এক বছর ধরে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর্তন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় একজন সিনিয়র পাইলটের বেতন কমে হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। মহামারীর আগে যিনি বেতন পেতেন ট্যাক্স বাদ দিয়ে ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। করোনার দুঃসময়ে পাইলটরা ঝুঁকি নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছেন। এক বছরে ২৫ জন পাইলট করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এখনো একাধিক পাইলট করোনা পজিটিভ নিয়ে হাসপাতালে আছেন। আটজন পাইলটের পুরো পরিবার করোনায় আক্রান্ত। ফ্লাইট করে এসে কোয়ারেন্টাইনের সুযোগও ছিল না তাদের। ফ্লাইট নিয়ে বিদেশে গিয়ে নিজের টাকায় করোনা টেস্ট করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের বেতন কর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়নি। অথচ ফাইন্যান্স বিভাগের লোকজন ক্ষমতাবলে বেতন বাড়িয়ে নিয়েছেন। একদিকে আর্থিক সাশ্রয়ের অজুহাতে বেতন কর্তন করা হয়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নতুন করে পাইলট নিয়োগ দিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত