মানচিনির অধীনে বিরক্তিকর কাতানেচিও ঘরানা থেকে আমূল বদলে যাওয়া ইতালির কাছে নাম্বার ওয়ান বেলজিয়াম আটকে গেল ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে। শুক্রবার মধ্যরাতে মিউনিখে ২-১ গোলে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মদের হতাশায় ডুবিয়ে ২০১২ সালের পর আবারও সেমিফাইনালে ইতালি। লড়াই-পাল্টা লড়াইয়ে প্রথমার্ধে হওয়া ২-১ গোলের সমীকরণেই নিষ্পত্তি হলো ম্যাচ। টানা ১৪টি করে ম্যাচ জেতা দু’দলের লড়াইয়ে একটির জয়রথ থামা অবধারিতই ছিল। বেলজিয়ামকে সেই খাদে ফেলে ইতালি নিজেদের জয়ের জাতীয় রেকর্ডকে টানা ৩২ ম্যাচে নিয়ে ঠেকাল। সেমিফাইনালে অপর জায়ান্ট স্পেনকে পেয়েছে ইতালি। মঙ্গলবার দু’দলের লড়াই হতে যাচ্ছে ২০১২ ইউরো ফাইনালের পুনরাবৃত্তি।
অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনার কোয়ার্টারের দুই অর্ধ হলো দু’রকম। দাপুটে আক্রমণাত্মক ফুটবলে খেলে ইতালি প্রথম ৪৫ মিনিট। দ্বিতীয়টিতে এগিয়ে এসেছিল বেলজিয়াম। কিন্তু ইতালির মতো গোল আদায় করে নিতে ব্যর্থ হয় তারা। দু’বার সমতা ফেরানোর খুব কাছে গিয়েও লুকাকু গোল করতে পারেননি। একবার লুকাকুর দুর্বল শট ফাঁকা পোস্টে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেন ইতালির প্রথম গোল স্কোরার বারেলা। যদিও পরিকল্পিতভাবে শট রুখতে পারেননি লুকাকু। দৌড়ের ওপর বল তার পায়ে লাগে। আরেকবার বাঁ প্রান্ত দিয়ে ডকুর ভাসানো আড়াআড়ি ক্রসে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি লুকাকু। হেডের জন্য লাফ দেওয়ার আগেই একটু সামনে এগিয়ে যাওয়ায় বলের ফ্লাইট মিস করেন। মিস করেন তার ডানে থাকা থরগান হ্যাজার্ডও। ম্যাচের শেষাংশে ইতালির সামান্য সময়ক্ষেপণের মানসিকতায় হতাশা বাড়ে রবার্তো মার্তিনেজের দলের।
অথচ প্রথমার্ধে পুরোটাজুড়েই ছিল ইতালি। ভিএআর রিভিউতে অফসাইডের কারণে লিওনার্দো বোনুচ্চির মিনিটের গোলটি বাতিল হয়। তবে এগিয়ে যেতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি ইতালিকে। গোলদাতা নিকোলো বারেলা। সিরি আ’তে লুকাকুর ইন্তার সতীর্থ বারেলাকে ডাকা হয় ‘মেজেলা’ বলে। অর্থ করলে দাঁড়ায় যার চোখ সব সময় থাকে বলের দিকে। মিডল থার্ডে দাঁড়ালেও কখন যে পেছন থেকে এসে বল কেড়ে গোল করে চলে যাবেন, ডিফেন্ডাররা বুঝতেও পারবেন না। এদিনও ৩১ মিনিটে বেলজিয়াম বক্সের ওপর মিস পাস থেকে বল পেয়ে তিন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সেকেন্ড পোস্টে গোল করেন। ৪৪ মিনিটে ইনসিনিয়ের গোলটি ছিল দেখার মতো। তবে এ জন্য বেলজিয়ান ডিপ ডিফেন্ডারদের ভুল ছিল চোখে পড়ার মতো। বিনা চ্যালেঞ্জে ডি বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের বাঁকানো শটে গোল করেন নাপোলি তারকা। তবে দুই মিনিট পর ডকুকে ডি বক্সে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় বেলজিয়াম। তা থেকে গোল করে আসরে নিজের চতুর্থ গোল করেন লুকাকু।
ম্যাচ হেরে নিজেদের ভাগ্যকে দুষছেন কেভিন ডি ব্রুইনে। শুধু ইতালি নয়, অনেক কিছুর সঙ্গেই লড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি। ডি ব্রুইনের বিশ্বাস তবুও সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে তারা, ‘সমর্থকরা দেখেছে আমরা মাঠে কী করেছি। আজ আমাদের হ্যাজার্ড ছিল না, আমি শতভাগ ফিট ছিলাম না। এ ছাড়া দ্বিতীয়ার্ধে ২-২ করার সুযোগ ছিল কিন্তু ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। তাই বলব আমরা অনেক কিছুর সঙ্গেই লড়েছি। প্রথমার্ধে ইতালি ভালো খেলেছে, দ্বিতীয়ার্ধে আমরা ভালো করেছি। কিন্তু দিন শেষে আমরা হতাশার প্রান্তে।’ যার ভুলে বেলজিয়াম প্রথম গোল হজম করেছে সেই ইয়ান ভারতোঘেন দোষ দিচ্ছেন ইতালিকেই, ‘সবাই দেখেছে শেষদিকে ইতালি সময় নষ্ট করেছে। মাঠে এমন কিছু পীড়া দেয়। তবে আমার ভুল হলো আমি প্রথম গোলের আগে বল মিস করি। ওই বলটা ধরে রাখতে পারলে গোল হজম করতাম না আমরা।’
ম্যাচসেরা ইনসিনিয়ে বলছেন, এভাবেই এগিয়ে যেতে চান তারা। ১১ জুলাইয়ের আগে থামতে চান না। দলে উপভোগের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার জন্যই এমন দুর্দান্ত খেলছে ইতালি। নাপোলি ফরোয়ার্ড বলেন, ‘সব কৃতিত্ব মানচিনির। সে দলে এমন পরিবেশ তৈরি করেছে যে আমার মনে হয় সপ্তাহান্তে নাপোলির হয়ে আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলছি। আমাদের মধ্যে দারুণ একতা তৈরি হয়েছে। আমাদের সবার কাছেই বিষয়টা ভালো লাগছে, উপভোগ করছি। মানচিনি বলেছে ফুটবলে উপভোগটাই বড় বিষয়। তবে আমরা এখনো কিছু জিতিনি তাই থামার সুযোগ নেই। আমরা এটা নিয়ে এগোতে চাই ১১ জুলাই পর্যন্ত।’ কোচ মানচিনি স্বীকার করেছেন শেষদিকে তার দল নেতিবাচক খেলেছে। তার কাছে এর কারণ ক্লান্তি, ‘এটা ঠিক শেষ ১০ মিনিট আমরা ভালো খেলিনি, ছেলেরা ক্লান্ত ছিল। কিন্তু আমরা যোগ্য দল হিসেবে জিতেছি। আমরা আরও গোল পেতে পারতাম।’ ১৯৬৮ সালের পর আবার স্পষ্টভাবে ইউরো জয়ের স্বপ্ন দেখছে ইতালি। মানচিনিও সেই স্বপ্নে বিভোর কিন্তু সামনে স্পেন বলে তার ভাবনাটা সংযত, ‘আমরা অবশ্যই শিরোপা জয়ের দাবি রাখি। সামনে স্পেন, এটাও ঠিক কোনো টুর্নামেন্টে যত এগোবেন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্ত হবে।’
