ব্যাপারটা কাকতালীয় কি? শেখ আবদুল হাকিম এক যুগ আগে লিখেছেন, “আমার বিশ্বাস আমাদের অনেকের মধ্যে বুলবুল চৌধুরীর ভালো কিছু প্রসব করার কথা। চাষাভুষো মানুষের ভাষা এমন আদর করে আর কাউকে আমি ব্যবহার করতে দেখিনি। ঈশ্বরের দিব্যি, এখনো তার কলম থেকে আরও অনেক ‘টুকা কাহিনী’ আশা করি। এত বিচিত্র যার অভিজ্ঞতা তার তো লেখালেখি নিয়েই মেতে থাকা উচিত।” যতক্ষণ শরীরে কুলায় বুলবুল চৌধুরী লেখালেখি নিয়ে মেতেই ছিলেন, শেখ আবদুল হাকিমের লেখালেখি নিয়ে মত্ততা ছিল আরও বেশি। তিনি বয়সেও বড়। শেষদিকে দুজনের কারও শরীরই ভালো যাচ্ছিল না। দুজন একই দিনেই ২৮ আগস্ট ২০২১ চিরজনমের বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেহেতু শেখ আবদুল হাকিম বয়োজ্যেষ্ঠ, তিনি বুলবুল চৌধুরীর কয়েক ঘণ্টা আগেই নিষ্ক্রান্ত হয়েছেন। সন্ধ্যা না হতেই বুলবুল চৌধুরী তাকে অনুসরণ করলেন।
সত্তরের দশকের একেবারে শেষ দিকে ইত্তেফাকের উল্টোদিকে ‘দেশবন্ধু সুইটমিট’ থেকে বের হওয়া পুরু চশমা পরা বাবড়ি দোলানো যে মানুষটির পেছনে পেছন হেঁটে অনেকটা পথ মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্টো দিকে সোনালী ব্যাংক পর্যন্ত চলে এসেছি একালের ভাষায় এটাকে বলে স্টকিং; এটি ফৌজদারি অপরাধ। তার পরনে আলুথালু জিন্স, শার্টটি ধবধবে সাদা। আমি আসলে তার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। আমি কদিন আগেও তাকে দেখেছি, সেলিম রেজা বলেছেন, তিনিই বুলবুল চৌধুরী। সেলিম রেজা লেখকদের অনেককেই চেনেন, আমার চেনাজানা তার সিকিভাগও নয়। আমি যে বুলবুল চৌধুরীর পেছনে একজন ‘স্টকার’ সেটাও বুঝিনি। আমি তার পেছন ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। যদি পেছন ফেরেন, যদি আমার ওপর তার চোখ পড়ে আমি হাত তুলে বিড়বিড় করে সালাম দেব। তারপর একটা কিছু বলব। উল্টোদিক থেকে হেঁটে হেঁটে আসছেন সুদর্শন গল্পকার বারেক আব্দুল্লাহ। তিনি বুলবুল চৌধুরীর পথ আগলে ধরলেন, সুতরাং আমিও আটকা পড়লাম। বারেক আব্দুল্লাহ বুলবুল চৌধুরীকে চেনেন, কমবেশি আমাকেও। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দুজন কোথায় যাচ্ছেন? দুজন কোথায়? বুলবুল চৌধুরী তো একাই। স্টকারকে তো আর সঙ্গী বলা যায় না। এর মধ্যেই আমি কথাটা বলার সুযোগ পেয়ে যাই। সালাম না দিয়েই বলে ফেলি, আমি আপনার ‘টুকা কাহিনী’ পড়েছি। তিনি টুকা ও মায়মুনার ভাষায় আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কন? আমি ভাবলাম হয়তো কথাটা শোনেননি, পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি বললেন, আপনেরে জিগাই, কিছু হইছে নি? এইডা কিছু হইছে? আমাকে জবাব দিতে হয়নি। বারেক আবদুল্লাহ দার্শনিকী চালে বললেন, সময়ের ওপর ছেড়ে দিন। সময়ই বলে দেবে কিছু হয়েছে না হয়নি।
আমার তখনো টুকা ঘোর কাটেনি। এমন দু’একটা গল্প লিখতে পারলেই তো যথেষ্ট। সে সময় কয়েকজন লেখকের মাসে চার-পাঁচটা গল্পও ছাপা হতো। লেখকদের নাম বলতে পারলেও তাদের কোনো গল্পের নাম ও কাহিনী যে শোনাতে পারব না তাতে এতটুকু সন্দেহ নেই। ২০১১ সালে একদিন বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে এক রিকশায় বাংলাবাজার থেকে পল্টন পর্যন্ত আমি। রিকশাওয়ালা কিছুটা বেপরোয়াভাবে বেশ কটা রিকশাকে ওভারটেক করে এগোয়। বুলবুল ভাই রিকশাওয়ালাকে বলেন, আজরাইল ধাওয়াইতাছে নাকি? ফুট্টুস কইরা দমডা বাইরইয়া যাইব। মিয়া তিনটা উপন্যাস লেখার বাকি। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমার কটা বাকি? কটা বাকি সেদিকে না গিয়ে বললাম বুলবুল ভাই, আপনি তো আমাকে একটা গল্প দান করলেন। গল্পের নাম ‘আজরাইলের ধাওয়া’। গত দশ বছরেও আমার সে গল্প লেখা হয়নি। ক’বছর আগে বুলবুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন, কাম সারছেন? আমি থ হয়ে থাকি। আবারও বললেন, ‘আজরাইলের ধাওয়া’ লেখছেন নি? না লেখলে ফেরত দিয়া দেন। আমিই লেখমু। আজরাইলে আমারে ধাওয়াইতাছে।
বুলবুল চৌধুরী সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ারের বারবার নিষেধ উপেক্ষা করে যেদিন সমকালের চাকরিটা ছেড়ে দিলেন সেদিনও তার সঙ্গে দেখা তিনি তার গ্রামের বাড়ির দৃশ্য আমাকে ভিসুয়ালাইজ করালেন এবং বললেন, গ্রামে চলে যাবেন, শহরের জন্য কোনো টান রাখতে চান না। তাই চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। চাকরি তখন আমাকেও ছেড়ে গেছে। বুলবুল ভাই বললেন, লেখক হওয়ার চেয়ে বড় চাকরি আর কিছু আছে নাকি।
বুলবুল চৌধুরী আমাদের কালের একজন মৌলিক কথাশিল্পী। মৌলিকত্বের অনেক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তার কথা ধার করেই বল আমাদের তিনজন খ্যাতিমান লেখকের বেশ জাঁকালো একজন সম্পর্কে বললেন, আরে ধুর, সব বানাইয়া বানাইয়া লেখে। লেখা ভেতর থেকে হয়ে আসতে হবে। যারা বুলবুল চৌধুরীর রচনার সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন কতটা জীবন্ত তার রচনা। কহ কামিনী, তিয়াসের লেখন, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে, জলটুঙ্গি, দক্ষিণা বাও সবই কাদামাটির মানুষের গল্প, যার কোনোটাই ‘বানাইয়া বানাইয়া’ লেখা নয়, সবগুলো হয়ে ওঠা কাহিনী, ভেতর থেকে উঠে আসা ভাষা।
বুলবুল চৌধুরী ভাওয়ালের গ্রাম থেকে খোদ ঢাকা শহরে পিতা আব্দুল মতিন চৌধুরীর হাত ধরে অশেষ কৌতূহল নিয়ে প্রবেশ করলেন, তার অল্প কিছুকাল পর এই ঢাকাতেই আমার জন্ম। আমার সেই রিকশা-সফরে আমি বললাম, বুলবুল ভাই আপনার নগরে অবস্থান আমার চেয়ে বেশি সময়ের কিন্তু আপনার কথাসাহিত্যে নগর কোথায়? নগর জীবন উপেক্ষিত নয় কি? তিনি যেভাবে বললেন, তা অনেকটা এ রকম : আরে মিয়া, আমার গোড়া কি শহরে নাকি, গোড়া ভাওয়ালের গ্রামে। ছয় সাত বছর পর্যন্ত গ্রামে যা দেখছি আর যা জমাইছি, এক জীবনেও তা লেইখ্যা শেষ করন যাইব না। এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সত্যি। বৃক্ষ যেমন তার মূল থেকে রস আহরণ করে বিকশিত হয়, লেখকের বেলাতেও তাই। কৃত্রিম আবাস, কৃত্রিম আশ্রয় থেকে লেখক দু’হাত ভরে নিতে পারেন না। বুলবুল চৌধুরীর জন্ম ১৬ আগস্ট ১৯৪৮। ৯ বছর পর ১৯৫৭-এর একদিন তার পা পড়ে রাজধানী ঢাকায়। কেএল জুবিলী স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ঢাকায় এসে দেখলেন মাটির নয় পিচঢালা পথে চলছে ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, রিকশা এবং হরেক যান্ত্রিক যানবাহন। চৌদিকে মাথা উঁচিয়ে আছে ইট, সুরকি, সিমেন্টের গাঁথুনি তোলা পুরনো দিনের কত না পাকা দালান। চেনা নয় নগরের লোকজনও। শেষ পর্যন্ত বুলবুল চৌধুরী নগরের কিছু প্রান্তজন ছাড়া অন্য কাউকে চিনতে পারেননি, চেনার চেষ্টাও করেননি। সাহিত্য জীবনের শুরুতে রাজধানীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথিত মূলধারায় তিনি ছিলেন না কিংবা নগরের ব্রাহ্মণ্যবাদ তাকে ঠেকিয়ে রেখেছে। জোনাকি, ঝিনুক, চিত্রবাক নামের সিনেমা মাসিকে তার শ্রেষ্ঠ বেশ কটি লেখা ছাপা হয়েছে। প্রথম লেখা ছাপার হরফে আসে ১৯৬৭ সালে, ঢাকায় আসার ঠিক দশ বছর পর। কিন্তু এমন নয় যে লিখতেই হবে এমন ব্রত নিয়ে পড়ে ছিলেন। শুরুতে সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন। একসময় সাহিত্যের নগর মোড়লরাও বুঝতে পারলেন বুলবুল চৌধুরীকে উপেক্ষা করার জো নেই। একবার একটি পুরস্কারপ্রাপ্তির পর আমি তাকে অভিনন্দন জানাবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলাম। বুলবুল ভাই বললেন, টেকাটা ছাড়া পুরস্কার টুরস্কারের কোনো মূল্য আছে নাকি। আর টেকা? চামড়া ব্যাপারীর খতির ভিতরে দশ-বিশ লাখ টেকা তো থাকেই। আসলে টেকারও দাম কম।
তিনি যাদের বন্ধু ছিলেন তাদের অন্যতম গল্পকার কায়েস আহমেদ। তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে একটি স্মরণীয় অবিচুয়ারি লিখলেন : আমার বন্ধু কায়েস আহমেদ। ‘তারপর তো সে আত্মহননের ভেতর দিয়ে জীবনের ইতি টানল। .... আজ মনে হয় তার অন্তরে গুমরে চলা কিছু বিষয় ছিল। সেসব আত্মস্থ করতে গিয়েই কি সে মৃত্যুকে নিজেকে একীভূত করল!’ মৃত্যুবরণের এরচেয়ে শৈল্পিক ও ভয়ংকর বর্ণনা আর কী হতে পারে। পায়ের যন্ত্রণা নিয়ে শিল্পী ধ্রুব এষ হাসপাতালে। বুলবুল ভাইয়ের শরীরও তখন তেমন ভালো নয়। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আমার কথা ফালাইয়া থোন। আমি মরলে দু’চারজন মানুষ টের পাইব, ধ্রুব মরলে সারা দেশ। ধ্রুব যে আমারও বিশেষ প্রিয়ভাজন বুলবুল ভাই জানবেন। আমি জানি বুলবুল চৌধুরী বিহীন বাংলাদেশ ধ্রুব এষের জন্য অনেক কষ্টেরই হওয়ার কথা এবং আরও কারও কারোর।
বুলবুল চৌধুরীকে নিয়ে যখন একটি অক্ষম অবিচুয়ারি লিখছি তখন তো জানিই যে তার পাঁচ ঘণ্টা আগে শেখ আবদুল হাকিম বিদায় নিয়েছেন। তিনিই ওপারে বুলবুল চৌধুরীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। লেখাটা দু’পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর দেখি একই দিনে এ দুজনের অনুগামী হয়েছেন এ সময়ের একজন সেরা রম্য লেখক আতাউর রহমান (দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ খ্যাত)। ভালোই হয়েছে সার্বক্ষণিক কৌতুক বলতে পারা এমন একজন সঙ্গে থাকলে দুজন বেশ মজাই পাবেন। এক সময় তার সঙ্গে একই দপ্তরে চাকরি করতাম। একদিন তিনি বললেন, তার প্রথম সন্তান হওয়ার পর বিশ্ববাসী জেনে গেল তার চরিত্র খারাপ। অমনি তার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন একই দোষে তার শ্বশুরও দুষ্ট এবং একজন বড় বুজুর্গের নাম নিয়ে বললেন তার সাত সন্তান, তার সম্পর্কে কিছু বলে গুনাহগার হতে চাই না।
বুলবুল চৌধুরী হারার মানুষ নন। ক্যানসারের সঙ্গে লড়ে তিনি হেরে যাননি। ক্যানসারকে একটি ওয়াকওভার দিয়েছেন। হালে করোনাভাইরাসের প্রকোপে ক্যানসার তার কৌলীন্য ও ঘাতকগুণ হারাতে বসেছিল। বুলবুল ভাইকে ভিকটিম দেখাতে পারলে ক্যানসারের গুরুত্ব একটু বাড়ে। আসলে তাই ঘটেছে। ফুট্টুস কইরা দমটা...।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক