মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে প্রধান করে আফগানিস্তানে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ গঠন করেছে তালেবান। সরকারে হাসান আখুন্দের ডেপুটি হিসেবে কাজ করবেন তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও মৌলভী আবদুল সালাম হান্নাফি। খবর বিবিসি ও সিএনএন। ।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন সরকারের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের দেশের মানুষ নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে। দ্য ইসলামিক আমিরাত প্রয়োজনীয় সরকারি কাজকর্ম সম্পাদনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
আলজাজিরা বলছে, সংবাদ সম্মেলনে জবিউল্লাহ মুজাহিদ নতুন ইসলামিক সরকারের ৩৩ সদস্যের নাম ঘোষণা করেন এবং অবশিষ্ট পদে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানান।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে গত ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের দখল নেয়। এরপর কয়েক দফা পিছিয়ে গতকাল ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রিসভার ঘোষণাকে তালেবানের সরকার গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মনে করা হচ্ছে।
তালেবান মুখপাত্র জানান, আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করবেন তারা। এই সরকারের প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ। তার ডেপুটি হিসেবে আছেন মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও মৌলভী হান্নাফি। অন্তর্বর্তী সরকারের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন হক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা সিরাজউদ্দিন হক্কানি। এছাড়া মোল্লা ইয়াকুব ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আমির খান মুত্তাকি ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মোল্লা হেদায়েতুল্লাহ বাদরিকে ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রীর (মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্স) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পাওয়া অন্যরা হলেনÑ শিক্ষামন্ত্রী মৌলভী নূরুল্লাহ মুনির, তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মোল্লা খায়রুল্লাহ খায়েরখাহ, অর্থমন্ত্রী (মিনিস্ট্রি অব ইকোনমি) ক্বারী দ্বীন হানিফ, হজমন্ত্রী মৌলভী নূর মোহাম্মদ সাকিব, আইনমন্ত্রী আবদুল হাকিম শাহরি, সীমান্ত ও উপজাতিবিষয়ক মন্ত্রী মোল্লা নূরুল্লাহ নূরী, গ্রামীণ পুনর্বাসন ও উন্নয়নমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ইউনুস আখুনজাদা, গণপূর্তমন্ত্রী মোল্লা আবদুল মান্নান ওমারি, খনিজ ও পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ এশা আখুন্দ, পানি ও জ¦ালানিমন্ত্রী মোল্লা আবদুল লতিফ মানসুর, বেসামরিক বিমান ও পরিবহনমন্ত্রী মোল্লা হামিদুল্লাহ আখুনজাদা, উচ্চতর শিক্ষামন্ত্রী আবদুল বাকি হক্কানি, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী নাজিবুল্লাহ হক্কানি, শরণার্থীমন্ত্রী খলিলুর রহমান হক্কানি, গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক আবদুল হক ওয়াসিক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক হাজি মোহাম্মদ ইদ্রিস, প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক কার্যালয়ের পরিচালক আহমাদ জান আহমাদী, দাওয়াত-উল-এরশাদমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ খালিদ, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ফাজিল, সেনাপ্রধান ক্বারী ফসিউদ্দিন, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শের মোহাম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই, উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলভী নূর জালাল, উপতথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী জবিউল্লাহ মুজাহিদ, গোয়েন্দা বিভাগের প্রথম উপপ্রধান মোল্লা তাজমির জাভেদ, গোয়েন্দা বিভাগের প্রশাসনিক উপপ্রধান মোল্লা রহমাতুল্লাহ নাজিব এবং মাদকবিরোধী উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোল্লা আবদুল হক আখুন্দ।
বিবিসি বলছে, আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধে তালেবানের সঙ্গে মিলে অসংখ্য প্রাণঘাতী হামলা করেছে হক্কানি নেটওয়ার্ক। এখন পর্যন্ত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রয়েছে হক্কানি নেটওয়ার্ক। এই সংগঠনের নেতা সিরাজউদ্দিন হক্কানি এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত। তালেবান ও আল কায়েদার সঙ্গে যুদ্ধের পর সিরাজউদ্দিন হক্কানির মাথার দাম ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মোল্লা ইয়াকুব ২০১৬ সাল থেকে তালেবান গোষ্ঠীর অন্যতম উপনেতা হিসেবে রয়েছেন। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে।
অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত হলেও দীর্ঘদিন ধরেই তালেবানের রাজনীতিতে যুক্ত মোল্লা হাসান আখুন্দ। তালেবানের আগের সরকারেও মন্ত্রী ছিলেন তিনি। জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকায়ও নাম রয়েছে তার। প্রায় ২০ বছর ধরে আখুন্দ তালেবানের নেতৃত্বদানকারী কাউন্সিল ‘রাহবারি সুরা’ প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সরকার ঘোষণার পর মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ আফগানদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক লিখিত বার্তায় তিনি বিদেশি সেনা প্রত্যাহার, দখলের অবসান ও দেশকে মুক্ত করায় নাগরিকদের এ শুভেচ্ছা জানান।
আখুন্দ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রতিশ্রুত মন্ত্রিসভা শিগগিরই কাজ শুরু করবে। নেতারা দেশে ইসলামি আইন ও শরিয়াহ বাস্তবায়ন, সর্বোচ্চ স্বার্থরক্ষা, আফগান সীমান্ত সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম করবেন।’
দেশ ও জীবনের সবকিছু ইসলামি আইন অনুসারে পরিচালিত হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর আফগানিস্তান চাই। তালেবান দ্বিপক্ষীয় শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে দৃঢ় ও সুস্থ সম্পর্ক চায়। মানবাধিকার, সংখ্যালঘু ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ইসলামের আলোকে রক্ষা করা হবে।’
পাকিস্তানবিরোধী বিক্ষোভে তালেবানের গুলি : আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কেন্দ্রস্থলে পাকিস্তানবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে শূন্যে গুলি ছুড়েছে বন্দুকধারী তালেবান সদস্যরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে রয়টার্স।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ভিডিওতে দেখা গেছে, মুহুর্মুহু গুলির শব্দে অনেক লোক দৌড়ে পালাচ্ছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন বলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
আগের দিন সোমবার নারীদের ছোট একটি দল উত্তরাঞ্চলীয় শহর মাজার-ই-শরিফে তাদের অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়ে মিছিল করে। গত শুক্র ও শনিবার কাবুলের পথে নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন একদল নারী সাংবাদিক ও অধিকার আন্দোলন কর্মী।
গত শনিবারের বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকে মিছিল করে যাওয়ার চেষ্টাকালে তালেবান কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা রক্ষীরা তাদের বাধা দিলে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ নারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ও পেপার স্প্রে ছোড়ে তালেবান নিরাপত্তারক্ষীরা।
সম্প্রতি কাবুল ও হেরাতে এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ দেখা গেছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।
