ফুটবল মাঠ থেকে কারাগারে যাওয়ার ঘটনা বিশ্ব ফুটবলে বিরল। অথচ সেই বিরল ঘটনাটাই ঘটেছিল এই দিনে এবং এই বাংলাদেশেই।
১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দেশের ফুটবলের ইতিহাসে পাকাপাকি এঁকে দিয়েছে কলঙ্কের দাগ। সেদিন আলোচিত আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ পরবর্তী ঘটনায় রীতিমতো হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল দেশের ফুটবলের অন্যতম সেরা চার কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, প্রয়াত গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ারকে। চারজনই ছিলেন আবাহনীর তারকা।
তখন ছিল স্বৈরাচারী সরকারের আমল। মাঠে রেফারি, সহকারী রেফারিকে মারধরের অভিযোগে সামরিক আদালতে চারজনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। চারজনকে দুটি আলাদা কারাগারে কারাবাস করতে হয় ১৭ দিন। এই ঘটনা এই চার ফুটবলারকে ইতিহাসে পাকাপাকি ঠাঁই দিয়েছে।
সেবার লিগ শিরোপা এক ম্যাচ বাকি থাকতেই নিশ্চিত করেছিল মোহামেডান। চির প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে শিরোপা দেখে স্বভাবতই তেতে ছিলেন আবাহনী খেলোয়াড়, ভক্ত, সমর্থকেরা। লিগের শেষ ম্যাচটি ছিল দু’দলের। ম্যাচের আগেই গ্যালারি ভরে উঠেছিল হাজারো সমর্থকে। প্রথমার্ধে কোহিনুরের গোলে এগিয়ে যায় মোহামেডান। সাদা-কালো সমর্থকদের শিরোপার আনন্দ যেন বহুগুণে বেড়ে যায় তাতে।
ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতে হট্টগোলের সূত্রপাত। কাজী আনোয়ারের জোরালো শট গোললাইন থেকে রুখে দেন মোহামেডান কিপার মোহসীন। কিন্তু আবাহনীর দাবি ছিল সেটি গোললাইন অতিক্রম করেছে। ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারি মুনির হোসেন ছুটে যান লাইন্সম্যান মহিউদ্দিনের কাছে। মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে গোল বাতিলের বাঁশি বাজান মুনির। তাতেই মেজাজ হারান আবাহনীর ফুটবলাররা। তারা চড়াও হন রেফারিদের ওপর। তাতেই যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি পড়ে। উত্তাল হয়ে ওঠে আবাহনীর গ্যালারি। মাঠে অনবরত শুরু হয় ইট-পাটকেলের বৃষ্টি।
গ্যালারির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের আশপাশে। ক্ষুব্ধ দর্শক গুলিস্তান এলাকায় ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটায়। ম্যাচ পণ্ড হয়ে যায়।
সে সময় ফুটবলে এ রকম হট্টগোলের দৃশ্য ছিল নিয়মিত। কিন্তু আসল ঘটনা ঘটে ম্যাচের রাতে। আবাহনীর কিছু ফুটবলার যোগ দেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। কেউ কেউ ফিরে যান ক্লাবে। আর কেউ যান বাড়িতে। তৎকালীন সামরিক সরকার ঘটায় নজিরবিহীন এক ঘটনা। আবাহনীর দেশি-বিদেশি ফুটবলারদের জাতীয় দলের ক্যাম্প, ক্লাব ও বাসা থেকে আটক করে নিয়ে যায় রমনা থানায়।
সালাউদ্দিন, হেলাল, চুন্নু, আনোয়ারদের সঙ্গে ছিলেন শ্রীলঙ্কার পাকির আলী, প্রেমলালের মতো তারকারাও ছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীলঙ্কান হাইকমিশন দুই খেলোয়াড়কে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলেও শাস্তির মুখে পড়তে হয় ওই চার তারকাকে। পরের দিন সকালে তাদের হাজির করা হয় শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে স্থাপিত আঞ্চলিক সামরিক আদালতে।
আদালত দেশদ্রোহের মামলায় চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। কাজী আনোয়ারকে এক বছর, হেলালকে ছয় মাস, সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে এক মাস সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের পাঠানো হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। ততক্ষণে অবশ্য ফুঁসে ওঠে গোটা ফুটবল অঙ্গন। সে সময় মোহামেডানের তারকা বাদল রায়, ব্যাডমিন্টন তারকা কামরুন্নাহার ডানা, ফুটবল তারকা আব্দুল গাফফারসহ ক্রীড়াঙ্গনের আরও মানুষের নেতৃত্বে হাজারো ভক্ত সমর্থক চার তারকাকে বন্দী করার প্রতিবাদে ঢাকা শহরে শুরু করে জোরদার আন্দোলন। অবস্থা সুবিধার নয়, বুঝতে পেরে ট্রেনযোগে চার ফুটবলারকে পাঠানো হয় রাজশাহী ও যশোর কারাগারে।
সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে যশোর এবং হেলাল ও কাজী আনোয়ারকে পাঠানো হয় রাজশাহী কারাগারে। তবে পূর্ণ মেয়াদে কাউকেই কারাভোগ করতে হয়নি। জনমানুষের প্রতিবাদের মুখে ১৭ দিনের মাথায় ৮ অক্টোবর তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় স্বৈরাচার সরকার।
সেই দিনটি ভাস্বর হয়ে আছে দেশসেরা লেফট আউট আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর স্মৃতিতে, ‘এই স্মৃতি কখনই ভোলার নয়। আমৃত্যু এটা মনে থাকবে। ফুটবল খেলে কারাভোগ করার এমন নজির আমি বিশ্বে খুব একটা দেখিনি। কিন্তু আমাদের বেলায় সেটা হয়েছিল।’
অতীতে ফিরে তিনি বলতে থাকেন, ‘অনেক স্মৃতিই আছে। রায় হওয়ার পর যখন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেছে। তখন বেগতিক দেখে আমাদের চারজনকে নিয়ে যাওয়া হয় কমলাপুর স্টেশনে। আমাদের চারজনকে নিয়ে একসঙ্গে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে আনা হয়। আমরা তখনো জানতাম না, আমাদের দু’ভাগে ভাগ করে দুই কারাগারে পাঠানো হবে।’
‘যখন ঈশ্বরদীর দায়িত্বরত পুলিশরা আমাদের বিচ্ছিন্ন করছিল, তখন একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আমরা কোনোভাবেই চাচ্ছিলাম না বিচ্ছিন্ন হতে। খুব কান্না করছিলাম। আমাদের এই অবস্থা দেখে পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কান্নার রোল পড়ে। তখনই বুঝেছি মানুষ আমাদের কতটা ভালোবাসে।’
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু আরো বলেন, ‘আরেকটা ঘটনা বলি। যশোর কারাগারের সামনে যখন আনা হয়, তখন আমি আর সালাউদ্দিন ভাই হাউমাউ করে কাঁদছিলাম। কারাগারের মূল ফটকে দেখি এক উঁচা-লম্বা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরিহিত লোক দাঁড়িয়ে আমাদের অপেক্ষায়। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কর্নেল শওকত আলী। তিনি দু’হাত প্রসারিত করে আমাদের জড়িয়ে ধরে বললেন, আরে ব্যাটা তোরা কাঁদছিস কেন। তোদের দেখভালের জন্য তো আমি আছি।’
‘তোদের কোনো কষ্ট হতে দেব না। এটা শুনে এত ভালো লাগল, মনে হলো একজন অভিভাবক পেলাম। এরপর গণমানুষের চাপের মুখে যখন মেয়াদের আগেই আমাদের মুক্তির দেওয়া হলো, তখন দেখেছি আমাদের ঘিরে মানুষের বাঁধভাঙা উল্লাস। আরেকবার বুঝতে পেরেছি এ দেশের মানুষ ফুটবলকে কতটা ভালোবাসে।’
রাজশাহীর কারাগারে প্রয়াত হেলালের সঙ্গে ছিলেন সেই ম্যাচে দলের নেতৃত্ব দেওয়া কাজী আনোয়ার। যার গোল বাতিলেই ঘটে এই ঘটনা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আনোয়ার বলেন, ‘সেই ম্যাচে মোহামেডান এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে। ৮০ মিনিটে আমার একটি গোল বাতিলকে কেন্দ্র করে আবাহনীর খেলোয়াড়রা চড়াও হয়েছিল রেফারিদের ওপর। সেই উত্তেজনা প্রথমে গ্যালারি, এরপর ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকায়। মেজাজ হারিয়ে আমি প্রথম সহকারী রেফারির ওপর চড়াও হই। এরপর হেলালও তাকে পেটায়।’
‘তখন চলছিল সামরিক শাসন। মাঠের সেই গন্ডগোলকে তারা পুঁজি করে আমাদের চারজনকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়। ক্রীড়াঙ্গনে পড়ে কালির ছোপ।’
কাজী আনোয়ার আরো বলেন, ‘তখন আমাদের তারকাখ্যাতি আকাশচুম্বী। তাই ঢাকায় এক কারাগারে রাখার সাহস দেখায়নি সে সময়ের সামরিক সরকার। আমাকে আর হেলালকে রাজশাহী ও অন্য দুজনকে পাঠানো হয় যশোর কারাগারে। ১৭ দিন কারাবাসের পর অবশ্য আমাদের শাস্তি মওকুফ করা হয়। হেলাল কিন্তু আট বছর আবাহনী ক্লাবে আমার রুমমেটও ছিল। কাকতালীয় ব্যাপার আমাদের দু’জনকেই একসঙ্গে পাঠানো হয় রাজশাহী কারাগারে। রুমমেট থেকে হয়ে গেলাম জেলমেট।’
সেই ম্যাচে মোহামেডানের হয়ে খেলেছিলেন বাদল রায়, আব্দুল গাফফাররা। মাঠের শত্রুতা ভুলে এরাই আবার চার ফুটবলারকে কারামুক্ত করতে রাজপথে নামেন। তাদের মুক্ত করতে চেষ্টার কমতি ছিল না । বাদল রায় বেঁচে নেই। কিন্তু সেই স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন গাফফার, ‘মাঠে সেদিন আমরাও ছিলাম। কিন্তু পরে যখন চার ফুটবলারকে ধরে নিয়ে গেল তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার, সেটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি।’
‘আমরা জোর চেষ্টা করি তাদের ছাড়িয়ে আনতে। কিন্তু দেশদ্রোহ ও সরকারকে উৎখাত করার মতো মিথ্যে মামলায় চারজনকে অভিযুক্ত করে নানা মেয়াদে শাস্তি দেয় সামরিক আদালত। এরপর আমরা আপামর জনসাধারণকে নিয়ে তাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করি দেশজুড়ে। একটা সময় মানুষের চাপে তাদের ১৭ দিনের মাথায় মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। জয় হয় ফুটবলের।’
তবে গাফফারকে এখনো একটা ব্যাপার খুব পীড়া দেয়, ‘সে সময় বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন একজন সাবেক ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন। চার ফুটবলারকে বিনা অপরাধে জেলে পাঠাল। অথচ তিনি দায়িত্বশীল পদে থেকেও কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। উল্টো আমি সেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম বলে এশিয়াডের দলে আমাকে বিবেচিত করা হয়নি কারাবাস করা চার ফুটবলারের পাশাপাশি।’
গাফফার বলেন, ‘সেই কালো দিন দেশের ফুটবলের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে। আর এর মধ্য দিয়েই ফুটবলের প্রতি মানুষের অনুরাগটা বোঝা গেছে।’
৩৯ বছর আগের সেই কলঙ্কময় দিনটি তাই দেশের ফুটবলের ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর হিসেবে।
