আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া একজন প্রজ্ঞাবান ও পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
প্রত্নতত্ত্ববিদ, অনুবাদক, নৃ-বিজ্ঞানী, পুথি বিশারদ, ক্রীড়া সংগঠক ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ১০৪ তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি অনলাইনে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের চারপাশে অনেক বিদ্বান কিংবা পণ্ডিত মানুষ আছেন, কিন্তু সবাই পরিপূর্ণ মানুষ নয়। যাকারিয়া এমন একজন মানুষ যাকে স্মরণ করা এবং অনুসরণ করা যায়। তিনি যাদের সাথেই কাজ করেছেন, একটা ছাপ রেখে গেছেন। তাকে কেউ ভুলতে পারবেন না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন তিনি।’
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘তার বাসায় একদিন গিয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম। বিছানার চারপাশে শুধু বই আর বই। তিনি শুয়ে, বসে লিখছেন-পড়ছেন। অবসরে যাওয়ার পরও তিনি যেভাবে পরিশ্রম করতেন, কাজে ব্যস্ত থাকতেন, সেটা দেখে অবাক হয়েছিলাম।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা সংগীত পরিবেশন করেন অরুনা সরকার। সূচনা বক্তব্য দেন ইশরাত জাহান কাঁকন। তিনি বলেন, ‘আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার সমৃদ্ধ কর্মময় এবং সুদীর্ঘ সৃজনশীল জীবন আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। তার জন্মদিন উদ্যাপনের মাধ্যমে, তাকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা অনুপ্রাণিত হই, উৎসাহিত হই। আর তাই প্রতি বছর ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি তার জন্মদিন উদ্যাপন করে আসছে। ভবিষ্যতেও আমরা উদ্যাপন করতে চাই।’
আলোচনা পর্বে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সম্পাদক এবং এশীয় দেশসমূহের স্থপতিদের সংগঠন আর্ক এশিয়ার সভাপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, ‘আমরা আজ এমন সময়ে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়াকে স্মরণ করছি, যখন দেশের প্রত্নসম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে। ফলে আজকের সময়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ যাকারিয়াকে স্মরণ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এখন এমন একটি সময় যখন দেশে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও প্রত্নসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। তাই আমরা আশা করব বরেণ্য এই প্রত্নতত্ত্ববিদকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে যাতে আমরা তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের প্রত্নসম্পদ রক্ষায় কাজ করার শক্তি অর্জন করতে পারি। একজন সাবেক সচিব হলেও তিনি জ্ঞানভিত্তিক যে কোনো কর্মকাণ্ডে সবাইকে কাছে টেনেছেন, উৎসাহিত করেছেন।’
অধ্যাপক আহসানুল হাদী বলেন, ‘যেখানেই জ্ঞানের সন্ধান আছে, সেখানেই যাকারিয়া স্যার ছুটে যেতেন। স্যারের সঙ্গে কাজ করার সময় দেখেছি শেষ বয়সে তিনি লাঠি নিয়ে হাঁটলেও তিনি জ্ঞানচর্চায় ছিলেন নিরলস। একই সঙ্গে তিনি তুলনায় অনেক তরুণতরদের কথাও অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। এই গুণ আজ খুবই বিরল।’
যাকারিয়ার মেয়ে সুফিয়া আতিয়া বলেন, ‘আমার আব্বা আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া যত দিন বেঁচে ছিলেন তখন তিনি যেভাবে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তেমনি এই কমিটিও এখনো নিয়মিত তাকে স্মরণ করে চলেছে। আমরা আশা করব এই কমিটির কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তার কাজ ও সাধনা বেঁচে থাকবে।’
যাকারিয়ার ছেলে মারুফ শমসের বলেন, ‘আব্বাকে আমৃত্যু দেখেছি কাজের সাথে থাকতে। তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। অনেক বয়স হওয়ার পরও ওনার স্মৃতি ছিল প্রখর। অনেক জায়গায় আব্বার সাথে ঘুরতে গেলে তিনি বলতেন, এটা অমুক জায়গা। এখানে নদী ছিল। পথে মানুষের সাথে প্রচুর কথা বলতেন। রিকশাওয়ালা থেকে নানান পেশার মানুষের সাথে কথা বলতেন। অনেক জায়গা তিনি চিনতেন। জানার আগ্রহ প্রবল ছিল। সত্যভাষী ছিলেন, অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ছিলেন। উনি ভীষণ বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি সবাইকে সম্মান দিতেন। একজন রিকশাওয়ালা কিংবা বড় আমলা নয়, মানুষ হিসেবে সবাইকে সম্মান দিতে জানতেন। এটা সবাই পারে না।’
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রণয় পলিকার্প রোজারিও ও আফসানা আশা। সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মেয়ে জাকিয়া মাহফুজা যাকারিয়া ও সুফিয়া আতিয়া যাকারিয়া এবং ইশরাত জাহান কাঁকন ও অরুনা সরকার।
