প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, বর্তমান পুঁজিবাজার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন হয়। তারপর আবার বাড়ে। এটা স্থিতিশীল বৃদ্ধি। এটি অর্থনীতির কলেবর বাড়ার কারণে হচ্ছে। এটা শিক্ষারও ব্যাপার। কিন্তু অনেকেই সূচক বাড়তে দেখে না বুঝে বিরূপ মন্তব্য করেন। তারা সূচক বেড়ে গেছে দেখে ঝামেলা হতে পারে বলে মন্তব্যও করেন। অথচ জিডিপির সঙ্গে সঙ্গে সূচকের বৃদ্ধি স্বাভাবিক। গতকাল এক আলোচনা সভায় এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।
গতকাল বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে ‘পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বিনিয়োগ শিক্ষার গুরুত্ব’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ), যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন সালমান এফ রহমান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। বিএমবিএ সভাপতি ছায়েদুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডিবিএ সভাপতি শরীফ আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএমবিএর প্রথম সহ-সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান।
সালমান এফ রহমান বলেন, আমরা সূচকে আটকে গেছি। কিন্তু সূচক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয় সেটা আমি বলব না। তবে আমাদের দেখা উচিত অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারের কতটা উন্নতি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে জিডিপি যে হারে বেড়েছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সূচকের বৃদ্ধিও স্বাভাবিক। তবে আমাদের পুঁজিবাজারের মূল্যসূচকটি যেন হঠাৎ করে ওপরে না চলে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ধাপে ধাপে বাড়লে সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ বেড়ে গেলে ধস নামে। যেটা ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে হয়েছে। তখন সূচক শুধু বাড়ছিল, কোনো সংশোধন হচ্ছিল না। যে কারণে হঠাৎ করে ধস নামে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঠামোগত দুর্বলতা। বাজারে যে পরিমাণ লেনদেন হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু লন্ডন, নিউ ইয়র্কের বড় বাজার ছাড়াও মুম্বাই, করাচিসহ অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজারে উল্টো চিত্র। সেসব বাজারে লেনদেনের বড় অংশ আসে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ শিক্ষাটা খুবই দরকার। সেটা শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পেশাদারিত্ব আনতে হবে। মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ছাড়া একটি শেয়ারের নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) বা শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কত ছিল, গত কয়েক বছরের ট্রেন্ডের মতো পুঁজিবাজারের বেসিক না বুঝেও অনেকে এখানে বিনিয়োগে আসতে চান।
তিনি বলেন, এখন কেউ যদি উচ্চ পিইতে শেয়ার কেনেন, তবে হ্যাঁ কিনতে পারেন। উচ্চ পিইতে যে কিনবেন না, এমন তো নয়। তবে জেনে-শুনে কিনতে হবে। হয়তো কোম্পানির এমন কোনো খবর আছে, যাতে করে ভবিষ্যতে ইপিএস বাড়বে এবং পিই কমে আসবে। এখন এই শিক্ষাটা কে দেবে। এক্ষেত্রে ব্রোকারদের সহযোগিতা করা উচিত। বিদেশে প্রতিটি কোম্পানি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এটা আমাদের দেশেও করা যেতে পারে, যা মার্চেন্ট ব্যাংক করতে পারে। এ তথ্য বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে সহযোগিতা করবে। তবে একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে করতে হবে। যাতে কেউ ভুল পথে চালিত করতে না পারে।
সালমান এফ রহমান বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করা দরকার। এই খাতটিকে শক্তিশালী করা হলে কোনো বিনিয়োগকারীর যদি মার্কেটের সম্পর্কে ধারণা না-ও থাকে, সেও ওখানে বিনিয়োগ করে রিটার্ন পাবে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট না থাকাটাও আমাদের বাজারের আরেকটি দুর্বলতা। এটি খুবই দরকার। বাজারে দুই ধরনের বিনিয়োগকারী থাকে। একটি অংশ ফিক্সড ইনকামের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে চায়। অন্যান্য দেশে ইকুইটি মার্কেটের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি বন্ড মার্কেট। তাই আমাদেরকে বন্ড মার্কেটি ভাইব্রেন্ট করতে হবে।
অনুষ্ঠানে এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, এমন অনেকে দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন, যারা আমানতকারী এবং বিনিয়োগকারীর পার্থক্য বুঝেন না। না বুঝে তারা এমন কিছু মন্তব্য করে ফেলেন, যা পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই পুঁজিবাজার সম্পর্কে জানতে হবে এবং দায়িত্বে থাকলে আরও গভীরে যেতে হবে। পুঁজিবাজার একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এখানে অনেক জানা-বোঝার আছে।
এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজার পরিপক্ব (ম্যাচিউরড) হওয়ার দিকে যাচ্ছে। এ সময় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আমাদেরকে সবার আগে ভালো এবং খারাপ দিকগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। এটা করতে শিক্ষার দরকার। পুঁজিবাজার খুবই সংবেদনশীল। এই বাজারে অন্য কারও সৃষ্ট আতঙ্ক যেন ক্ষতি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানান তিনি।
