সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ সংলগ্ন ঝিলংজা এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দের কার্যক্রম স্থগিত করেছে উচ্চ আদালত।
এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে সোমবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ তিন মাসের এ স্থগিতাদেশ দেয়।
রুলে বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওই জমি ইজারা দেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সেটি জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পরিবেশ ও বন সচিব, ভূমি সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে আদেশে।
আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) বিপুল বাগমার।
গত ৫ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘৭০০ একর বনভূমি প্রশাসন একাডেমির জন্য বরাদ্দ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে গত ৩ অক্টোবর হাইকোর্টে এ রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ঝিলংজা বনভূমির ওই এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ করতে সংরক্ষিত ওই বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে ভূমি মন্ত্রণালয় এই জমি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে, বন বিভাগ দাবি করেছে, এই জমি তাদের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ সালে একে রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে এবং এত বছর ধরে বন বিভাগ এটি রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। বিপন্ন এশীয় বন্য হাতিসহ বন্য প্রাণীদের নিরাপদ বসতি এই ঝিলংজা বনভূমি।
বন আইন অনুযায়ী, পাহাড় ও ছড়া সমৃদ্ধ এই বনভূমির ইজারা দেওয়া বা না দেওয়ার এখতিয়ার কেবল বন বিভাগের। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই জমি বরাদ্দ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এ বনভূমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা নিষেধ। এ কারণে বন বিভাগ থেকে ‘এই ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দপত্রে দেশের অন্যতম এই জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বনভূমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছে, বরাদ্দ দেওয়া জমির ৪০০ একর পাহাড় ও ৩০০ একর ছড়া বা ঝরনা। তারা জমির মূল্য ধরেছে ৪ হাজার ৮০৩ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু একাডেমির জন্য প্রতীকী মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা।
ভূমি মন্ত্রণালয় এলাকাটিকে অকৃষি খাসজমি দেখালে বন বিভাগ বন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে আপত্তি তোলে।
তারা জানায়, বন আইন অনুযায়ী ওই জমি বন বিভাগের আওতাধীন ‘রক্ষিত বনভূমি’ হিসেবে চিহ্নিত। ‘ওই জমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ বলে একটি চিঠিও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরকে দেয় বন বিভাগ।
রিট আবেদনকারী মনিরুজ্জামান কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালতে শুনানিতে বলেছি, এই সম্পত্তি বন মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি। কিন্তু সম্পত্তিটা নিচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়। আবার ভূমি মন্ত্রণালয় এটি দিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কার সম্পত্তি কে কাকে দেয়? বনভূমির মালিকানা যাদের তারা কিছু জানে না, অন্যরা জানে।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগ বলছে তাদের কাছে এ ধরনের কোনো চিঠি আসেনি, কেউ তাদের কাছে অনুমতিও নেয়নি। কেউ তাদের বলেনি। অথচ সম্পত্তির মালিক বন মন্ত্রণালয়। আদালত আমাদের বক্তব্য শুনে ওই বরাদ্দের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। চার সচিবের প্রতি কারণ দর্শাতে রুলও দিয়েছেন হাইকোর্ট।
