কর্তিত বেতন ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাসে আগের মতো ফ্লাইট চালানোর সিদ্বান্ত নিয়েছেন বিমান বাংলাদেশের পাইলটরা। এর আগের দেয়া কর্তৃপক্ষের আশ্বাস বাস্তবায়ন না হওয়ায় সোমবার রাতে হঠাৎ বেঁকে বসেন তারা। এতে বিমানের শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দেয়। এ অবস্থায় তড়িঘড়ি করে মঙ্গলবার পাইলটদের সঙ্গে জরুরী বৈঠকে বসে বিমান কর্তৃপক্ষ।
এতে সিদ্বান্ত হয় শনিবার বিমানের পর্ষদ বৈঠকে পাইলটদের কর্তিত বেতন ফিরিয়ে দেয়ার অনুমোদন নেয়া হবে। তারপরই সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে পাইলটদের দেখাদেখি বিমানের কেবিন ক্রুরাও বিভিন্ন দাবি দাওয়াতে সোচ্চার হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহি ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানান, পাইলটদের সঙ্গে সামান্য ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। তবে সোমবার রাতে সব ফ্লাইটই গেছে। প্রকৃতপক্ষে পাইলটদের কর্তিত বেতন ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টি আগেই নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ধাপে ধাপে তা পরিশোধেরও একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তুু করোনা মহামারিতে বিমান তো এমনিতেই আর্থিকভাবে বড় দূরাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর বোয়িংয়ের পাওনা কিস্তি মেটাতে হয়েছে। এ কারণে পাইলটদের একটা পার্ট গত মাসে দেয়া হয়নি। তবে পরবর্তী মাসের বেতনের সঙ্গে তা অবশ্যই দেয়া হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তিনি বলেন, এনিয়ে বাপার সঙ্গে আলোচনায় কোন দ্বিমত হবে না। এ বিষয়ে পরবর্তী পর্ষদ বৈঠকেই অনুমোদন নিয়ে তাদের পাওনাদি পরিশোধ করা হবে। এতে আর জটিলতা থাকবে না বলে আমার বিশ্বাস।
এদিকে বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে কাজে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। সেখানে পরিচালকরাও ছিলেন। সবার সঙ্গে বাপার নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছে। সেখানে সর্বসম্মতভাবে সবাই একমত হয়েছেন যে, আমাদের যে ওভারসিজ এ্যালায়েন্স যেটা আমাদের বেতনের অংশ, এটি আগামী শনিবারের বোর্ড মিটিংয়ে তোলা হবে।
তিনি আরো বলেন, সেখানে এটি সমন্বয় করে দেয়া হবে বলে আমাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এটা একটা মোটামুটি কনক্লুশনে আমরা আসতে পেরেছি। আমাদের সবারই ৭৫ ঘণ্টা ফ্লাইং আওয়ার হয়ে গেছে। মাসের কোটা আমরা ফিলআপ করেছি তারপরও আমরা ফ্লাইটগুলো করে দেব। অর্থাৎ চুক্তির বাইরে যে ফ্লাইটগুলো সেগুলো আমরা চালাব। শনিবারের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করছি।
গত বছর দেশে করোনা ভাইরাসের মহামারী শুরুর পর ব্যয় সংকোচন করতে অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে পাইলটদেরও বেতন কাটছিল বিমান কর্তৃপক্ষ। এ প্রেক্ষিতে এর আগে গত জুলাইয়ে একবার চুক্তির বাইরে ফ্লাইট চালাতে অস্বীকৃতি জানায় পাইলটরা। তবে সে সময় বিমান কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তারা।
বিমান জানিয়েছে, গত তিন মাসেও কর্তৃপক্ষ বেতন কাটার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসায় সোমবার থেকে আবার চুক্তির অতিরিক্ত ফ্লাইট চালানো বন্ধ করে দেয় বিমানের পাইলটরা। এতে মধ্য প্রাচ্যগামী অন্তত দুটি ফ্লাইটের শিডিউল ওলট-পালট করতে হয় বিমান কর্তৃপক্ষকে। ভোগান্তিতে পড়েন সেই ফ্লাইট দুটির শতাধীক যাত্রী। বেতন কাটা নিয়ে বিমানের আদেশ তাতে বলা হয়েছে, বিমানে কর্মরত ‘কর্মকর্তা’ এবং যেসব ককপিট ক্রুর চাকরির বয়স শূন্য থেকে পাঁচ বছর, জুলাই মাসে তাদের কোনো বেতন কাটা হবে না। তবে যেসব ককপিট ক্রুর চাকরির বয়স পাঁচ থেকে দশ বছর, জুলাই মাসে তাদের বেতন থেকে ৫ শতাংশ এবং যারা দশ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন, তাদের বেতন ২৫ শতাংশ কাটা হবে। এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন পাইলটরা।
বিমান সূত্র জানায়, পাইলটদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে তাদের বেতন ২ লাখ ৬ হাজার ৮৪ টাকা। যাদের চাকরির বয়স ৫ থেকে ১০ বছর, তারা ওভারসিজ ভাতা হিসেবে অতিরিক্ত পান ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। এতে তাদের বেতন হয় ৫ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। যাদের চাকরির বয়স ১০ থেকে ২০ বছর, তাদের বেতন ওভারসিজ ভাতাসহ ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আর যাদের চাকরির বয়স এর চেয়ে বেশি, তারা পান ১২ লাখ ১ হাজার টাকা।
এ ছাড়া চুক্তির অতিরিক্ত সময় দায়িত্ব পালন করলে তাদের আলাদা করে দেয়া হয় প্রোডাক্টিভিটি অ্যালাওয়েন্স। আগে পাইলটদের নির্দিষ্ট হারে যে ওভারসিজ ভাতা দেয়া হতো, সেটি করোনায় আয় কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তন করে বর্তমানে ফ্লাইং ঘণ্টা হিসেবে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমান বোর্ড। বর্তমানে বিমানে সব মিলিয়ে ১৫৭ জন পাইলট কর্মরত রয়েছেন। বাপার সঙ্গে বিমানের যে চুক্তি, সেটি অনুযায়ী একজন পাইলটের দৈনিক সর্বোচ্চ ১৩ ঘণ্টা কাজ করার কথা। সপ্তাহে একজন পাইলট কাজ করবেন সর্বোচ্চ ৭৫ ঘণ্টা। এর বাইরেও তিনি সপ্তাহে দুদিন ছুটি পাবেন।
