জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনো ফিরে আসার সুযোগ আছে

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১২:৩৩ এএম

জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়। এ সমস্যা ‘এখনকার’। আমরা এ বছর দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) সম্প্রতি জানিয়েছে, আমরা আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমা পেরিয়ে যাওয়ার খুব কাছাকাছিই আছি। আমরা আজ এই পরিস্থিতিতে পড়েছি কারণ, জলবায়ুবিষয়ক কর্মকাণ্ড বলতে আসলে চলেছে দুর্বল প্রতিশ্রুতির কারবার। তা-ও আবার সম্পূর্ণ পূরণ করা হয়নি। ‘ইমিশন্স গ্যাপ রিপোর্ট ২০২১ : দ্য হিট ইজ অন’-এ যেমনটা দেখা যাচ্ছে, প্যারিস চুক্তির অধীনে হালনাগাদ করা দেশভিত্তিক নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) এবং ২০৩০ সালের জন্য করা অন্যান্য প্রতিশ্রুতি (যা এখনো হালনাগাদ করা এনডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি) তা-ও একই ফাঁদে পড়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি, যার মধ্যে ‘নেট-জিরো’ অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত নয়) পরিবেশ থেকে ২০৩০ সালের অনুমিত নিঃসরণের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ সরাবে। দেশগুলো শুধু নিঃশর্তভাবে এনডিসি এবং অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বর্তমান অবস্থায় বাস্তবায়ন করলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা সম্ভবত প্রায় ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়াবে। এ ধরনের উষ্ণতাবৃদ্ধি স্পষ্টতই মানবজাতি ও অন্য অনেক প্রজাতির জন্য হবে এক মহাবিপর্যয়।

বৈশ্বিক উষ্ণতাবৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে হালনাগাদ এনডিসি ও অন্যান্য ২০৩০ সালের অঙ্গীকারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার চেয়েও বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ বাড়তি ২৮ গিগাটন সরিয়ে নিতে আমাদের কাছে আট বছর সময় আছে। এই সংখ্যাটিকে বোঝার জন্য বলি, ২০২১ সালে শুধু কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ৩৩ গিগাটনে পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যসব গ্রিনহাউজ গ্যাসকে বিবেচনায় নেওয়া হলে বার্ষিক নিঃসরণ হবে ৬০ গিগাটনের কাছাকাছি। সুতরাং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যে পৌঁছানোর সুযোগ পেতে আমাদের গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ প্রায় অর্ধেক করতে হবে। তবে ২ ডিগ্রি লক্ষ্যমাত্রার জন্য প্রয়োজন একটু কম হবে-২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক নিঃসরণ হ্রাস করতে হবে ১৩ গিগাটন।

পরিষ্কার করে বলতে গেলে, শুধু নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনার জন্য আট বছর সময় নেই আমাদের হাতে। আট বছর সময় আছে পরিকল্পনা ও নীতিমালা তৈরি, তার বাস্তবায়ন ও সর্বোপরি নিঃসরণ কমানোর জন্য। আমরা আসলে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়াচ্ছি। আমাদের গ্রহ, আমাদের সমাজ এবং আমাদের অর্থনীতি সত্যিই গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। জলবায়ু আলোচনার সাম্প্রতিকতম পর্ব কপ-২৬-এ সেই তাপ ভালোই অনুভূত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, করোনা মহামারী থেকে পুনরুদ্ধারের ব্যয়ের অর্থ নিঃসরণ কমাতে কাজে লাগানোর সুযোগটি অনেকাংশেই নষ্ট করা হয়েছে। পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ব্যয়ের মাত্র ২০ শতাংশকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো এদিকে পিছিয়ে পড়ছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ১১ হাজার ৮০০-এর তুলনায় নিম্ন আয়ের দেশে কভিড-১৯-এর পেছনে ব্যয় জনপ্রতি মাত্র ৬০ ডলার।

তবে আমরা এখনো হয়তো কাজটা করতে পারব। জানালাটা এখনো খোলা। দেশগুলোকে শুরু করতে হবে তাদের নতুন প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের জন্য নীতিমালা তৈরি এবং সেগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন শুরু করার মাধ্যমে। তারা ক্রমশ উচ্চাকাক্সক্ষা বাড়ানোর উপায় খুঁজে নিতে পারবে। বিশেষ করে ‘নেট-জিরোর’ প্রতিশ্রুতি দ্রুততর গতিতে বাস্তবায়ন করতে আরও সচেষ্ট হওয়ার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোট ৪৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী অভ্যন্তরীণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের অর্ধেকেরও বেশির সমতুল্য। কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা বৈশ্বিক উষ্ণতা শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি কমিয়ে আনবে। এটি পূর্বাভাস দেওয়া তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে কমিয়ে ২ দশমিক ২-এ নামিয়ে আনতে পারে। তবে অনেক দেশেরই জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় নেট-জিরো সময়সীমা ২০৩০ সালের পরে। দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের এনডিসিতে নেট জিরোর অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পদক্ষেপ গ্রহণের সময়ও এগিয়ে আনতে হবে। এই সম্প্রসারিত উচ্চাকাক্সক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের অবশ্যই নতুন নীতি প্রণয়ন এবং আবারও বলি সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করাও খুব জরুরি, যাতে তারা এরই মধ্যে ঘটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারার পাশাপাশি কম নিঃসরণের মাধ্যমেই প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারে।

‘ইমিশন গ্যাপ রিপোর্ট’ বলছে, নির্দিষ্ট বেশ কিছু খাত বড় অবদান রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্বল্পমেয়াদি জলবায়ু কর্মসূচিতে মিথেনের উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব রয়েছে। ২০ বছর সময়কালে কার্বন-ডাই অক্সাইডের চেয়ে মিথেনের উষ্ণায়নের সম্ভাব্য ক্ষমতা ৮০ গুণেরও বেশি। তবে বায়ুমণ্ডলে আবার মিথেন থাকতে পারে মাত্রই ১২ বছর। তেল-গ্যাস, কৃষি এবং বর্জ্য খাত থেকে মিথেনের হ্রাস কার্বন-ডাই অক্সাইড কমানোর চেয়ে দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে সীমিত করবে। আর তাই ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকারটি খুবই ভালো এক উদ্যোগ।

অন্যদিকে কার্বন বাজার প্রশমন ব্যয় হ্রাস করার মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই দেশগুলোর জন্য প্যারিস চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ চূড়ান্ত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য বাজার প্রতিষ্ঠা করা যাবে, যা কেবল অন্যখানের কার্বন ‘অফসেট’ বা আড়াল করবে না বরং নিঃসরণ হ্রাসের পথেই নিয়ে যাবে। তারপর (অতীতের ইমিশন গ্যাপ রিপোর্টেও যা দেখা গেছে) বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, জ্বালানির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আরও অনেক কিছুর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কাজেই এটা স্পষ্ট যে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার মতো অনেক বিকল্প রয়েছে। আমাদের হতাশ হওয়া যাবে না। আমরা এরই মধ্যে দেখিয়েছি জলবায়ুবিষয়ক কর্মসূচি ফল বয়ে আনে। ২০১০ সাল থেকে চালু নীতিগুলো এরই মধ্যে ২০৩০ সালের নিঃসরণের সম্ভাব্য মাত্রা কমিয়ে এনেছে। কিন্তু আমাদের প্রকৃত পার্থক্য গড়তে হবে, ছোটখাটো কিছুতে চলবে না। প্রজাতি হিসেবে মানুষ যে আসন্ন বিপদের মুখোমুখি সে সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের দৃঢ়ভাবে এগোতে হবে। এগোতে হবে আরও দ্রুত। আর তা শুরু করতে হবে এখনই।

লেখক : জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নির্বাহী পরিচালক। আল-জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত