একদলীয় বাকশাল কায়েম করতে সরকার জাতির ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তারা মুক্তিযুদ্ধের সব চিন্তাচেতনাকে ধ্বংস করেছে।’
এ অবস্থায় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণের হারানো অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান জানান তিনি।
বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রবিবার রাজধানী ঢাকায় বিএনপি আয়োজিত বর্ণাঢ্য র্যালির উদ্বোধনকালে দলটির মহাসচিব আলমগীর এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের নতুন করে সংগ্রাম শুরু এই র্যালি থেকে।
র্যালি শুরুর আগে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা–কর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন।
দুপুর দেড়টার মধ্যেই নয়াপল্টনে দলের কার্যালয় থেকে একদিকে নাইটিঙ্গেল মোড় অন্যদিকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থকদের দখলে চলে যায়। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ বিভিন্ন স্লোগানে পুরো নয়াপল্টন ও এর আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন।
এদিকে বিএনপির এই কর্মসূচির কারণে পল্টন, কাকরাইল, ফকিরাপুল, শান্তিনগরসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। এ কারণে মালিবাগ-মৌচাক, পল্টন-বিজয়নগর, কাকরাইল-নাইটিঙ্গেল মোড়, মালিবাগ-রাজারবাগ এলাকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। যানবাহন না পেয়ে অনেক পথচারীকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতেও দেখা যায়।
বিএনপির এই র্যালিকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালন করতে আশা দলের নেতা-কর্মীদের পৌঁছানোর আগেই কর্মসূচিস্থল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যের পর বেলা আড়াইটায় মির্জা ফখরুল ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ নেতা ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে র্যালি শুরু হয়। বিজয়নগর, কাকরাইল, শান্তিনগর মোড় হয়ে সেটি আবার একই পথে কাকরাইল, বিজয়নগর নাইটিঙ্গেল মোড়, পল্টন, ফকিরের পুল মোড় হয়ে আবার নয়াপল্টনে গিয়ে র্যালিটি শেষ হয়।
র্যালিতে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ শাখা, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীরা ঢাক–ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অংশ নেন। নেতা-কর্মীদের মাথায় ছিল লাল-সবুজ ক্যাপ, হাতে ছিল জাতীয় এবং বিএনপির দলীয় পতাকা। অনেক নেতা-কর্মীরা গায়ে ছিল কালো কাপড় এবং গলায় ছিল প্রতীকী শিকল। র্যালির সামনের দিকে খালেদা জিয়া, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের বড়-বড় ছবি বহন করা হয়। অনেক নেতা-কর্মীই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন। র্যালিতে পিকআপ-ভ্যান থেকে শাহনাজ রহমত উল্লাহর গাওয়া বিএনপির দলীয় সংগীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি বাজানো হয়।
র্যালিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে ট্রাক দিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়। দুপুর সোয়া ২টায় কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে র্যালির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিজয় মিছিল অনেকটাই খালেদা জিয়ার মুক্তির মিছিলে পরিণত হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে আমরা যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপন করছি, সেই সময় আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম মহিলা মুক্তিযোদ্ধা, এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে আটকাবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, সেই সময় আমরা বিজয় র্যালি করছি। তাই আজকের এই র্যালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, যুদ্ধ করেছিলাম একটি মুক্ত স্বদেশ পাব বলে। যুদ্ধ করেছিলাম আমাদের বাক্স্বাধীনতা থাকবে, সংগঠন করার স্বাধীনতা থাকবে এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি বাসযোগ্য ভূমি নির্মাণ করতে পারব বলে। যেখানে গুম, খুন, হত্যা নির্যাতন থাকবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমরা আজকে একটি অসহায় জাতিতে পরিণত হয়েছি।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আজ গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, জনগণের ভোটের অধিকার এবং লেখার ও কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আজকের এই র্যালি জনগণের নতুন করে জেগে ওঠার র্যালি, এ র্যালি বাংলাদেশের মানুষের নতুন করে সংগ্রাম শুরু করার র্যালি, এ র্যালি হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার র্যালি।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তার স্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। আজকে তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’
কর্মসূচিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালামসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা অংশ নেন।
