মুক্তিযুদ্ধের সময় নদী আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল। নদী আমাদের সহায়তা দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা পালন করেছে। তাই নদী আমাদের নিয়ামক। নদীর ক্ষতি কোনো বাঙালি করতে পারে না। নদী বাঁচলে স্বাধীন বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী মরে গেলে মানুষ বাঁচার কোনো সুযোগ থাকবে না। দেশের ইতিহাস রক্ষা ও মানুষের স্বার্থে নদীকে রক্ষা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার বালু নদীর পাড়ের কায়েতপাড়া এলাকায় ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ আয়োজিত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে “মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা” শীর্ষক পঞ্চম নদী কথন অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) এর অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ক এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আহসান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা অনেক। নদী আমার মা। আজকে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু নদী রক্ষা হচ্ছে না। সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানিরা যখন আমাদের আক্রমণ করে তখন আমরা নদীকে ব্যবহার করেছি। নদী ভরাট করে আমরা উন্নয়ন চাই না। আমরা নদী রক্ষার আন্দোলনে আছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে নদীকে রক্ষা করতেই হবে।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, একটা দেশের সম্পদ হলো নদী আর আমরা সেই নদীকেই ধ্বংস করে ফেলছি। পরিকল্পনা যা হোক নদী পাড়ের মানুষকে যুক্ত করতে হবে। যুদ্ধ শেষ হয়নি। এই সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের নদীগুলোকে।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল তা ছিল মূলত: নদী দ্বারা বিভক্ত। ১০ নম্বর সেক্টর ছিল সমুদ্র বন্দর, নদী বন্দর আর নৌপথকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে সফলতা আসতে শুরু করে নৌকমান্ডো যখন অপারেশন শুরু করে। নদীভিত্তিক মোট ৫১০টি অপারেশন সম্পন্ন হয়েছিল, এর মধ্যে ৭৮টি অপারেশন হয়েছিল নৌকমান্ডোদের, ১৯৯টি রেলসেতুর ওপর আর ২৩১টি নদীর ওপর ব্রিজ অপারেশন সম্পন্ন হয়েছিল।
লেখক ও সাংবাদিক ফয়সাল আহমেদ বলেন, আমাদের জীবনের সাথে ভীষণভাবে জড়িত আমাদের নদীগুলো। সারাদেশে জালের মতো বিছিয়ে আছে আমাদের নদীগুলো। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের স্লোগান ছিল তাই, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নদী ছিল পরিচিত, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে নদী পরিচিত ছিল না। তাই তারা নৌযুদ্ধে এগুতে পারেনি খুব বেশি।
স্থানীয় নারী নেত্রী জান্নাতী আক্তার রুমা বলেন, নদীতে মিঠা পানি ছিল আর পানি ছিল স্বচ্ছ। আমরা এই বালু নদীর পানি খেতাম। নদীতে যখন ময়লা আসতে শুরু করে তখন আমরা বারোগ্রাম সমিতির মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দখল-দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়নি।
কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, আমাদের বাল্যকালে এই জায়গায় ছিল আমাদের সরকারি হাট। আমরা বাজার করতে আসতাম এই নদী দিয়ে। নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত,এই এলাকায় শাক-সবজি পাওয়া যেত।রাজধানীর বেশিরভাগ সবজির জোগান হতো এ এলাকা থেকে। কিন্তু দখল-দূষণের ফলে আবাদ কমে গেছে। নদীতে এখন আর মাছ নেই। উন্নয়নের বর্জ্য আমাদের নদীকে দূষিত করছে। পানিকে বিশুদ্ধ করানোর বন্দোবস্ত করা দরকার আর এর দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই।
