শুক্রবার ভোরে গাড়ি চলাচল করলেও বাতাসে পোড়া যানবাহনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। রাস্তায় খুব কম মানুষ ছিল। লোকে ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছিল।
সেনাবাহিনী এবং পুলিশ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো অবরোধ করে রেখেছে। সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহর।
আমরা শহরের প্রধান চত্বরে থাকা সৈন্যদের কাছে গেলে তারা আমাদের দেখে চিৎকার শুরু করে এবং আকাশে ফাকা গুলি চালায়। আমাদের তাদের কাছে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করে দেয়।
আমি গত কয়েক বছর ধরেই আলমাতিতে আসছি। এটি সাধারণত একটি কোলাহলপূর্ণ শহর, যেখানে প্রচুর সবুজ জায়গা এবং খাওয়া ও পান করার জায়গা রয়েছে। কিন্তু এখন সব দোকান ও ব্যাংক লুট বা ধ্বংস করা হয়েছে। সবকিছু আগের মতো হতে কিছুটা সময় লাগবে।
শহরের প্রধান চত্বরের চারপাশে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ শুরু করার সময় প্রথমেই এই চত্বরে এসেছিল।
আশেপাশের মিডিয়া ভবনে হামলা চালানো হয় এবং মেয়রের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে এখন তা কালো রঙ ধারন করেছে।
আমরা শুক্রবার কোনো বিক্ষোভ মিছিলের চিহ্ন দেখিনি। শুধুমাত্র একটি ছোট দলকে তাদের ফোন দিয়ে ছবি তোলার জন্য ধ্বংস হওয়া ভবনের কাছে জড়ো হতে দেখেছি।
কিন্তু আমরা এখনও গুলি এবং বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সম্ভবত স্টান গ্রেনেডের আওয়াজ।
আমি যখন শহরে প্রথম পৌঁছেছিলাম তখন আমি ভেবেছিলাম কুয়াশা পড়ছে। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে গ্রেনেড এবং আতশবাজির ধোঁয়ায় চারদিক ছেয়ে গেছে।
বেশ কিছু স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা হতবাক এবং ক্ষুব্ধ। এই বিক্ষোভ কাজাখস্তানে নজিরবিহীন, এবং অনেকেই অবাক হয়েছেন যে তা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং এতোটা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে।
আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের মধ্যে কয়েকজন রাশিয়া এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ থেকে সেনাবাহিনী আসতে দেখে আনন্দিত। তারা আশাবাদী রাশিয়ান সেনারা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।
এক নারী আমাকে বলেন, শুরু থেকেই সরকারের আরও শক্ত হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘তারা যদি শুরুতেই শক্তি প্রয়োগ করত, তাহলে এই অস্থিরতা ঘটত না’।
তবে সহিংসতার কারণে ক্ষোভের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহানুভূতিও ছিল। অনেক বিক্ষোভকারী গ্রামীণ এলাকা থেকে এসেছেন, যেখানে বেতন কম এবং জীবন কঠিন।
২২ বছর বয়সী এক বাবুর্চি বলেন, ‘আমি বিক্ষোভকারীদের দাবি বুঝতে পারছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আমাদের বেতন বাড়ছে না এবং বেশিরভাগ মানুষ টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। কিন্তু এখন লুটপাট ও গুণ্ডামি শুরু হয়েছে, সাধারণ মানুষ এখন ভুগছে। এটা বন্ধ করতে হবে’।
বড় সুপারমার্কেট বন্ধ থাকায় আলমাতির বাসিন্দারা এখন খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। যে দোকানগুলো খোলা আছে সেগুলো শুধু নগদ টাকা নেয়, কিন্তু টাকা তোলার জায়গা কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ইন্টারনেট নেই, এমনকি রাস্তায় ট্যাক্সিও পাওয়াও যাচ্ছে না।
ইন্টারনেট এবং ফোন নেটওয়ার্ক ঠিকভাবে কাজ না করায়, শহরের বাইরে কী ঘটছে তা জানা কঠিন। এমন সব গুজব ছড়ানো হচ্ছে যার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
কাজাখস্তান কখনোই এই মাত্রার প্রতিবাদ দেখেনি। এর আগেও অশান্তি হয়েছে। তবে সেসব অনেকাংশই স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। আগে কখনো মূল বিমানবন্দরে হামলা হয়নি।
জ্বালানির দাম বাড়ানোয় এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে, তবে সরকার সম্পর্কেও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে।
স্বাধীনতা থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা কাজাখস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি নুরসুলতান নজরবায়েভের পদত্যাগের পর লোকে আশা করেছিল নতুন নেতা কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ পরিবর্তন আনবেন।
কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়নি। বিশেষ করে প্রাক্তন নেতার সম্মানে রাজধানী আস্তানার নাম পরিবর্তন করে নূর-সুলতান করায় প্রমাণ হয়ে গেছে যে পুরোনো অভিজাতরাই এখনও ক্ষমতায় রয়েছেন।
আপাতত, পরিস্থিতি শান্ত হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষের হাতেই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই বিক্ষোভ আপাতত শেষ হয়ে গেলেও অসন্তোষ থেকে যাবে। সম্ভবত আরও একটি স্ফুলিঙ্গ থেকে নতুন করে আগুন জ্বলবে।
সূত্রঃ বিবিসি প্রতিবেদক আবদুজালিল আব্দুরাসুলভ
