প্রণোদনা ঋণ

পরিশোধে আরও ৪২ মাস সময় চায় বিকেএমইএ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৫৬ পিএম

করোনায় সবচেয়ে বেশি প্রণোদনার ঋণসুবিধা পেয়েছে রপ্তানিমুখি তৈরি পোশাক খাত। নামমাত্র সুদে সবচেয়ে বেশি প্রণোদনার ঋণ পাওয়া এ খাতটি এখন কিস্তি পরিশোধে আরও বেশি সময় চায়। ঋণ পাওয়ার দেড় বছরেরও বেশি সময়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা মাত্র চার কিস্তি পরিশোধ করেছেন। এখন অবশিষ্ট ১৪ কিস্তি পরিশোধে ৪২ মাস সময় চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। গত সপ্তাহে এমন চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি।

এর আগে পোশাক শিল্প মালিকদের অপর সংগঠন বিজিএমইএ ওই ঋণ পরিশোধে দ্বিগুণ সময় চেয়েছিল। এর বাইরে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের সুদ ও কস্ট অব ফান্ডসহ সব চার্জ মওকুফের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। মওকুফের পর অবশিষ্ট ঋণকে চলতি বছরের জানুয়ারিভিত্তিক স্থিতির ওপর ২ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্টে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের দাবি জানিয়েছে পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। 

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে দেওয়া বিকেএমইএ সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময়ের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করে কারখানাগুলো। কিন্তু উদ্যোক্তারা পোশাক তৈরির জন্য তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিকসহ অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। আন্তর্জাতিকভাবে কনটেইনারের সংকট ও আকাশচুম্বী ভাড়া, সুতার দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, চীনে বিদ্যুৎ ঘাটতিতে কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি কারণে তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বহু গুণে বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে নিট পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি।

বিকেএমইএ সভাপতি আরও লিখেছেন, সংকটকালেও তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা লোকসান দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে রপ্তানি আদেশ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জাহাজ ও কনটেইনার সংকটের কারণে রপ্তানি পণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখনো ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করছে। ক্ষেত্রবিশেষে মূল্যছাড় দেওয়াসহ নানা শর্ত আরোপ করছে।

এ ছাড়া নিট কারখানার জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিকেএমইএর সভাপতি। তিনি দাবি করেন, কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানি হলেও তার বিপরীতে ক্রেতারা নিদিষ্ট সময়ে অর্থ না দেওয়ায় তারল্য সংকট দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে ইডিএফ থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন পোশাকশিল্পের মালিকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ইডিএফ থেকে ঋণের অর্থ পরিশোধে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চান বিকেএমইএর সভাপতি। একই সঙ্গে সব ধরনের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দেওয়া ঋণ সীমা (ব্যাক টু ব্যাক ক্রেডিট লিমিট) ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের মার্চে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়ে পড়লে তৈরি পোশাক শিল্প রক্ষায় এগিয়ে আসে সরকার। সে সময় প্রণোদনার অংশ হিসেবে রপ্তানিমুখি তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের চার মাসের বেতন-ভাতা দিতে কয়েক দফায় মোট ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নামমাত্র সুদের ঋণ দেয় সরকার। দেড় বছরেরও বেশি সময় পর ওই ঋণ পরিশোধে বারবার সময় বৃদ্ধির আবেদন জানাচ্ছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন। সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধে মালিকরা সময় চাইলে সরকার মেনে নেয়। সেই সময় শেষে ঋণ পরিশোধ শুরু করেছেন মালিকরা। তবে আবার ঋণ পরিশোধে সময়ও চাইছেন পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।

প্রণোদনার তহবিল থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কারখানার মালিক ঋণ নিয়েছেন। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছয় মাস। পরবর্তী ১৮ মাসের কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধের শর্ত ছিল। তবে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রণোদনা ঋণের গ্রেস পিরিয়ডের সময় বাড়ানোর দাবি জানালে অর্থ মন্ত্রণালয় ঋণ পরিশোধের সময় গত ১ মার্চ থেকে আরও ছয় মাস বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়।

প্রসঙ্গত, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮ শতাংশ। এরমধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে নিটওয়্যার খাত। অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ খাতটির রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ১১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ। একই সময়ে ওভেন গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। পোশাক শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, প্রচুর ক্রয়াদেশ থাকায় আগামীতে রপ্তানি আয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত