লড়াইটা পুঁজিবাদী উন্নতির বিরুদ্ধেই

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৫২ পিএম

সংবাদপত্রে নানা ধরনের সংঘর্ষের খবর পড়ি। বলা হয় দেশে এখন রাজনীতি নেই। সেটা এই অর্থে যে দেশে এখন কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই না জাতীয় সংসদে না রাজপথে, অথবা জনপদে। কিন্তু তাই বলে শাসক দলের ভেতর দ্বন্দ্ব থাকবে না এ কেমন কথা? স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা হয়েছে। বিরোধ অন্যত্রও ঘটছে। সব খবর পাই না, যা পাই তা কখনো কখনো হাস্যকরও এবং করুণও শোনায়। বরগুনায় এমপি সুলতানা নাদিরা সবুরের বাসা ‘তাক করে’ আরেক এমপি এবং নাদিরারই প্রতিবেশী বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। দুজনেই যে আওয়ামী লীগের এমপি সেটা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। নাদিরা সবুরের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়েছে এই বলে যে তার বাড়িতে নেতাকর্মীদের গমনাগমনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্যই ওই আয়োজন। ওদিকে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই এমপি হাচান রহমান রিমনের বক্তব্য এই যে ক্যামেরা দুটি তিনি বসিয়েছেন কারও বাসার ওপর নজরদারির জন্য নয়, স্রেফ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে। (ইত্তেফাক, ০৬.১০.২০২১) আবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বড় নাকি ইউনিয়ন নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বড় তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার ঘটনা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, এবং হাইকোর্ট চেয়ারম্যানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ভয়ংকর ঘটনার খবরও আছে। যেমন ঢাকা শহরেই চাঁদার ভাগ না দেওয়ায় খুন হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ। ফরহাদ ছিলেন ঢাকার বাড্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। নয়জন নাকি এই খুনের কা-ে জড়িত। ফরহাদ এলাকা থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন, তুলে ওই নয়জন এবং তাদের প্রবাসী নেতাকে চাঁদার একটা ভাগ দিতেন, কিন্তু একসময়ে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন; তারই নগদ প্রতিফল তার এই প্রাণদান। (কালের কণ্ঠ, ১৮.০৯.২১) এদের রাজনৈতিক কাজটা কী ধরনের বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই। ভাগাভাগির ঝগড়াটা আসলে ক্ষমতারই দ্বন্দ্ব। এবং ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব সর্বত্রই প্রধান হয়ে উঠেছে, কেননা এর বাইরে অন্য সফর আদর্শিক বন্ধনের ভীষণ আকাল পড়েছে। তাই দেখা যায় জুমার জামাতে খুতবার আজান মসজিদের কোন জায়গা থেকে দিতে হবে তা নিয়ে মুসল্লিদের দ্বন্দ্ব-বিরোধে একজন নিহত এবং দশজন আহত হন। ঘটনা কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বঙ্গিরা থানা এলাকার একটি জামে মসজিদের ভেতরে। (কালের কণ্ঠ, ১৮.০৯.২১)

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকে, ক্ষমতার প্রয়োগও ঘটে। ফুটবলের জগতে অমর খেলোয়াড় ম্যারাডোনা। জাদুকর বলা হয় তাকে। আসলেই সে রকমই ছিল তার দক্ষতা ও প্রতিভা। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতা অপপ্রয়োগের। ম্যারাডোনার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার বিপুল প্রশংসার পাশাপাশি কিউবার এক নারীর অভিযোগও প্রকাশ পেয়েছে। এই নারী বলছেন, বিশ বছর আগে বয়স যখন তার ১৭ তখন ম্যারাডোনা তাকে ধর্ষণ করেছেন। মেয়েটি ম্যারাডোনার অসম্ভব রকমের ভক্ত ছিলেন, তার কাছাকাছি থাকতে চাইতেন। এই রকম কৈশোরিক মোহগ্রস্ততার কালে একদিন হোটেলের এক কক্ষে ম্যারাডোনা তার মুখ চেপে ধরে তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযোগের সত্যমিথ্যা আমরা জানি না, তবে একজন পরলোকগত মানুষের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে তিনি এনেছেন সেটা হয়তো ব্যক্তিগত কোনো মুনাফার আশায় নয়, হতে পারে গভীর দুঃখ থেকেই। তবে ক্ষমতাবানদের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগে উদ্দীপ্ত হওয়া তো অসম্ভব কোনো কাজ নয়, বিশেষ করে যদি ভয় না থাকে ধরা পড়বার, দায় না থাকে জবাবদিহির। খেলাধুলায় যে বর্ণবাদ ছিল না, তা নয়। খুবই ছিল। খেলার মাঠে দর্শকরা ভিন্ন বর্ণের খেলোয়াড়দের দুয়ো দিত। তারা ক্ষমতাবান তাই ক্ষমতা প্রদর্শন অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মাঠে নয় শুধু দলের ভেতরেও চলছে বর্ণবিদ্বেষ। দুই যুগ ধরে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট দলে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন নাসের হোসেন; তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত। দলের ভেতর তিনি বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগ করেননি। কিন্তু এখনকার খেলোয়াড়রা করছেন। বাধ্য হচ্ছেন করতে। ইয়র্কশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের উপমহাদেশীয় খেলোয়াড়রা বলছেন ক্লাবের শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়রা তাদের ‘পাকি’ বলে ঠাট্টা মস্করা করে। ‘পাকি’ বলতে কেবল যে পাকিস্তানিদের বোঝায় তা নয়, সব উপমহাদেশীয়দেরই সম্বোধনের ওই সম্মাননার ভাগিদার করার রেওয়াজ লন্ডনের পথেঘাটে হামেশাই ঘটে থাকে, এখন সেটা ক্রিকেট ক্লাবের ভেতর ঢুকে পড়েছে। শুধু ইংল্যান্ডই বা কেন এমনকি ভারতের দুজন সাবেক খেলোয়াড়ও সম্প্রতি ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন যে গাত্রবর্ণ কালো বলে তারা নিজেদের অর্থাৎ ভারতীয়দের দলের ভেতরেই তারা অপমানিত বোধ করেছেন। মোট কথাটা দাঁড়াচ্ছে এই যে উন্নতি ঘটছে বিপুল পরিমাণে, কিন্তু তাতে বৈষম্যও বাড়ছে, ক্ষমতাবানরা আরও ক্ষমতাবান হচ্ছে, ক্ষমতাবঞ্চিতদের বর্ধিত পরিমাণে বঞ্চিত করে। কোনো এক জায়গাতে নয়, সর্বত্র।

যেমন বাংলাদেশে ঘটছে হাতিনিধন। সেটাও উন্নতির কারণেই ঘটছে। বনভূমি যারা জবরদখল করেছে তারা নিজেদের চাষাবাদের সুবিধার জন্য হাতির চলাচল থামানো দরকার ভেবে বিদ্যুতের তাজা তার বসিয়েছে; এবং তাতে স্পৃষ্ট হয়ে হাতি মারা যাচ্ছে। আবার পেশাদার লোকও লাগানো হচ্ছে হাতি মারবার জন্য। এমন আশঙ্কা নাকি দেখা দিয়েছে যে উন্নতির মাসুল গুনতে গিয়ে বাংলাদেশকে হয়তো হস্তিশূন্যই হতে হবে, এক সময়ে। ধরা যাক এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণের ব্যাপারটা। উন্নতির জন্য এই উন্নত চলাচল ব্যবস্থা খুবই দরকার। কিন্তু এর মাসুল তো দিতে হচ্ছে ওই নির্মাণযজ্ঞের নিচে চলাচলকারী নিরীহ মানুষদেরই। চট্টগ্রাম শহরে ওই হাইওয়ে তৈরির কাজ বেশ কিছুদিন ধরে সাড়ম্বরে চলেছে, কিন্তু নিচে যে নালাগুলোর মুখ হাঁ করে পড়ে রয়েছে সেদিকে নজর দেওয়ার অবসর নেই নির্মাণকর্তাদের। বিগত কয়েক মাসে খোলা নালাতে পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন চারজন পথচারী। যেন তাদের জীবনের কোনো মূল্যই নেই।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাতে এলাকার বিস্তর উন্নতি ঘটবে। পর্যটকরা আসবেদেশ থেকে আসবে, বিদেশ থেকেও আসতে থাকবে; যাতায়াত ব্যবস্থায়, আলোতে, উজ্জ্বলতায়, ভবন-নির্মাণে, এবং অর্থের উপচেপড়াতে প্রচুর উন্নতি ঘটবে এলাকার; কিন্তু যুগ যুগ ধরে সেখানে বসবাস করছে যে মানুষরা তারা কাঁপছে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। চোখে অন্ধকার দেখছে। কার কাছে যাবে, কে শুনবে কথা তারা জানে না। পাহাড়ে যা সমতলেও তা। ব্যাপার ওই একই। গাইবান্ধা উপজেলার গোবিন্দগঞ্জে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভালো কথা। কিন্তু তাতে যে দেড় হাজার সাঁওতাল পরিবার বাস্তুহারা হবে, তাদের দেখবে কে? তারা যাবে কোথায়? খাবে কী? তাহলে ভরসা কোথায়? ভরসা দেখা যাচ্ছে তরুণরাই। কিন্তু তরুণরা তো ভালো নেই। এবছর বাংলাদেশের যে তরুণদের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তাদের ভেতর এক দুই হাজার নয়, আটাত্তর হাজার ছয়শত জন পরীক্ষা দিতে আসেনি। ঝরে আগেও পড়ত, তবে এবারের সংখ্যা অনেক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে এদের অধিকাংশই মেয়ে; এই মেয়েদের অনেকেরই হয়তো বিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে, কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো অভিভাবকদের সামর্থ্য নেই পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাওয়ার। ছেলেরাও বিপুল সংখ্যয় আসেনি। তাদের অভিভাবকরাও হয়তো সংগতিহীন হয়ে পড়েছেন। ছেলেদের কেউ কেউ হয়তো সামান্য হলেও উপার্জনের কাজে যুক্ত হয়ে গেছে। তবুও তরুণরাই পারবে। আর পারবে সেই বয়স্করাও যাদের ভেতর তারুণ্য রয়েছে। আছে উৎসাহ, উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং প্রতিবাদের সাহস। এগুলো সবই তারুণ্যের গুণ। দিনাজপুরের যে স্কুল-ছাত্রীটি বাবা-মা তাকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে দেখে দৌড়ে থানায় চলে গেল এবং আশ্রয় চেয়েছে, তার সেই সাহসটা তারুণ্যেরই। জলবায়ু সম্মেলনে তরুণদের বিক্ষোভের ঘটনা তারুণ্যেরই প্রকাশ। তারুণ্য সেখানে সমবেত হয়েছে, সমষ্টিবদ্ধ হয়েছে। ঢাকায় নিরাপদ সড়কের দাবি তরুণরাই করছে।

ব্যক্তির সাহসের মূল্য আছে। কিন্তু সেই সাহস অনেক অনেক শক্তিশালী হয় যদি অনেকে থাকে এক সঙ্গে। তখন তা দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে। সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম একজন অনুসন্ধানী ও সাহসী সাংবাদিক। পেশাগত কাজেই গিয়েছিলেন সরকারের এক জরুরি দপ্তরে; দপ্তরের লোকেরা তাকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখে এবং পরে পুলিশ ডেকে তাদের কাছে হস্তান্তর করে। পরিণতিটা অন্যরকম হতে পারত যদি না তার সাংবাদিক সহকর্মীরা রাতে থানায় এবং পরের দিন সকালে আদালতে পাহারায় থাকতেন। রোজিনার বিরুদ্ধে মামলা জারি আছে, তিনি জামিনে আছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেটি চল্লিশটি দেশে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার উৎকর্ষ নিয়ে কাজ করে সেটি তাকে ‘অদম্য সাংবাদিক’ হিসেবে পুরস্কৃত করেছে। অনুষ্ঠানটি হয়েছে সংস্থাটির কেন্দ্রীয় দপ্তরে, আমস্টারডামে; রোজিনা অবশ্য যেতে পারেননি, কারণ তিনি জামিনে আছেন এবং তার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে; পুরস্কারটি তার পক্ষ থেকে তার স্বামীকে গ্রহণ করতে হয়েছে। বলাবাহুল্য, এটি কেবল স্বীকৃতিদান নয়, এটি সমর্থনদানও। সমর্থনটাই আসলে বড় ব্যাপার এখানে। সমর্থন আছে। সারা বিশ্বই এখন পুঁজিবাদী ফ্যাসিবাদের দৌরাত্ম্যে অস্থির অবস্থায় রয়েছে; এবং প্রত্যেক দেশেই মানুষ এর বিরুদ্ধে এক ভাবে না এক ভাবে লড়ছে। আন্দোলনকারীদের ভেতর আকাক্সক্ষা আছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। কিন্তু পুঁজিবাদীরা পারতপক্ষে এখন তাদের এক হতে দেবে না।

নোবেল শান্তি পুরস্কার যে প্রতিবছরই যথাপাত্রে অর্পিত হয় এমন নয়; তবে এ বছর দেখা গেল হয়েছে। শান্তিতে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দু’জন সাংবাদিক, ফিলিপিনের মারিয়া রিসা এবং রাশিয়ার দিমিত্রি মুরতেভ। এরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক, এবং সে জন্য নিজের দেশে সরকারি সহযোগিতা পাননি। তাদের কাজ করতে হয়েছে বিপদ-আপদের মধ্যে। তাদের কাজের এই যে স্বীকৃতি সেটাও সমর্থনই; বড় আকারে ও আন্তর্জাতিক মাত্রায় সমর্থন। এই সমর্থন আন্তর্জাতিক; এবং বিশ্বায়নবিরোধী। বিশ্বায়ন চলে মুনাফার তাড়ায়, আর আন্তর্জাতিকতা গড়ে ওঠে সংবেদনশীলতার অনুপ্রেরণায়। তারুণ্যের পাশাপাশি এই আন্তর্জাতিকতাও বিশ্বের জন্য এখন ভরসা। তারুণ্য বিদ্রোহ করবে, এটা প্রত্যাশিত। কিন্তু কার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সেটাও কিন্তু নিরূপণ অত্যাবশ্যকীয়। নানা রকমের অন্যায় চলছে, কিন্তু সব অন্যায়ের উৎস এখন দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন। ওই উন্নয়নের প্রচার অনেক, চাটুকারিতা বহুবিধ; দাপট, চাকচিক্য, বৈভব অপ্রতিহত। কিন্তু এই উন্নয়ন যে ইতিমধ্যেই মানুষের শত্রুতে পরিণত হয়ে গেছে, এবং শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতি ও প্রাণী জগতেরও সর্বনাশ ঘটাচ্ছে, তার এই বৈরী চরিত্রটিকে সুস্পষ্টরূপে চিহ্নিত করা আবশ্যক। লড়াইটা এখন এই উন্নতির বিরুদ্ধেই। প্রত্যেক দেশে, এবং সারা বিশ্বে। এবং তার লক্ষ্য অন্যকিছু নয়, সামাজিক বিপ্লব ভিন্ন।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত