১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে সাঈদা গাফফারকে হত্যা করে আনারুল

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৫০ পিএম

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের পানিশাইল এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসন প্রকল্পটির ভেতরে বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ঝোপঝাড়। সেখানে নির্মাণাধীন বাড়ির প্লট থেকে পাঁচটি গাছ বিক্রি করেন পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাঈদা গাফফার। গাছ কাটার চুক্তি নিয়েছিলেন ঘাতক আনারুল ইসলাম (২৫)। ওই দিন সন্ধ্যায় গাছ কাটা শেষ হলে নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে পানিশাইলের ভাড়া বাসায় ফেরার পথে অধ্যাপক সাঈদা পথিমধ্যে ব্যাগ থেকে আনারুলকে কিছু টাকা দেন। এ সময়ে ঘাতক আনারুল ব্যাগে একটি টাকার বান্ডেল দেখতে পায়। একপর্যায়ে জোরপূর্বক তার ব্যাগ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আনারুল।

টাকা নিতে বাধা দিলে অধ্যাপক সাঈদার গায়ে থাকা শীতের চাদর দিয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে আনারুল। মৃত্যু নিশ্চিত করে অধ্যাপক সাঈদার ব্যাগ থেকে ১০ হাজার টাকা, একটি বাটন ও একটি এড্রোয়েট মোবাইল ফোন এবং বাসার চাবি নিয়ে মরদেহটি একটি ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়। পরে এন্ড্রয়েড মোবাইলটি ঘটনাস্থলেই মাটি নিচে পুতে রাখে। সেখান থেকে অধ্যাপক সাঈদার ভাড়া বাসায় গিয়ে আলমারী খুলে টাকা-পয়সার খোঁজ করে ঘাতক আনারুল। কোন টাকা-পয়সা না পেয়ে সে পালিয়ে শ্বশুরবাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ি গিয়ে রাত্রিযাপন করে।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার বিকেলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. নিয়াজ মাখদুমের আদালতে মামলার একমাত্র অভিযুক্ত আনারুল এমনভাবেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এর আগে গত শনিবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন আদালতের বিচারক মেহিদী পাভেল তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আনারুলের। পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে।

নিহতের ছেলে ও মামলার বাদী সাউদ বিন ইফতেখার জহির জানান, তার মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসেবে ২০১৬ সালে অবসর নেন। বাবা জহিরুল হকও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তারা তিন বোন এক ভাই। দুই বোন অষ্ট্রেলিয়ায় থাকেন। এক বোন ও তিনি ঢাকায় বসবাস করেন। তাদের পৈত্রিক বাড়ি পুরানো ঢাকায়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের পানিশাইল এলাকায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবাসন প্রকল্পে’ তাদের ৫ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। এলাকাটিতে এখনো বসতি গড়ে ওঠেনি। তাই ঝোপ-জঙ্গলে ভরে আছে। তার মা সেখানে ভাড়া থেকে ওই প্লটে একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করছিলেন। বাড়ির একতলা কাজ প্রায় শেষ। গত ১১ জানুয়ারি মঙ্গলবার তার মাকে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বোন মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ করেন। কিন্তু তার মা ম্যাসেজ না দেখায় পরদিন বুধবার ফোন করেন। ফোন বন্ধ থাকায় ঢাকার বড় বোন সাদিয়া আফরিন ও মামা শেখ শমসের গাফফার মায়ের পানিশাইলের বাসায় গিয়ে ঘরের দরজা ও আলমারি খোলা দেখতে পান। অনেক খুঁজেও মাকে কোথাও না পেয়ে ওই রাতেই তার বোন কাশিমপুর থানায় সাধারণ ডায়রি করেন। শুক্রবার পুলিশ আনারুলকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যে শুক্রবার দুপুরে মায়ের লাশ প্রকল্প এলাকার একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিট পুলিশের উপ-কমিশনার (ক্রাইম-উত্তর) মো. জাকির হাসান জানান, ঝোপের ভেতর থেকে গত শুক্রবার অধ্যাপক সাঈদা গাফফারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার ছেলে সাউদ ইফখার বিন জহির থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর আগে আনারুলকে গত শুক্রবার সকালে গাইবান্ধার নিজ গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিন দিনের রিমান্ডে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সে।

জিজ্ঞাসাবাদে আনারুল জানায়, মঙ্গলবার বিকেলে গাছ কাটা শেষ হলে সন্ধ্যায় ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন অধ্যাপক সাঈদা। পথেই তিনি তার ব্যাগ থেকে আনারুলকে কিছু টাকা দেন। এ সময়ে ব্যাগে আরো টাকা দেখতে পায় আনারুল। একটি নির্জন স্থানে পৌঁছালে জোরপূর্বক তার ব্যাগ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। টাকা নিতে বাধা দিলে সে অধ্যাপক সাঈদার গায়ে চাদর দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে তাকে। মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশটি একটি ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়। বুধবার সকালে সে নিজবাড়ি একই জেলার সাদুলল্লাহপুরের জাউলিয়া গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করে। শুক্রবার পুলিশ তার খোঁজে ওই গ্রামে যায়। টের পেয়ে সে একটি মোটরসাইকেলে করে পালানোর চেষ্টার সময় কৌশলে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে অধ্যাপক সাঈদার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া ১০ হাজার টাকার মধ্যে দুই হাজার ৬৫০ টাকা এবং একটি বাটন মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত