অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বস্ত্র ও পোশাক খাতে শ্রম আইন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও বিনিয়োগ সহায়তা দরকার বলে জানিয়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা।
গতকাল রবিবার গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আলোচকরা এমন মতামত তুলে ধরেন। রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে সবুজ রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।
সাবের হোসেন চৌধুরী পোশাক খাত সবুজে রূপান্তরকে প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া তিনি এই খাতে ন্যায্যমূল্য ও কর সুবিধার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি পথনকশা প্রণয়নের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিকভাবে লাভজনক করার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বিশ^বাজারে বস্ত্র ও তৈরি পোশাকের অবস্থান আরও ভালো করতে হলে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানার বিকল্প নেই। শ্রমিকের জীবনমানের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন এখন থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি ভালো করছে, রপ্তানিও বাড়ছে। তবে সামনের দিনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম পরিবেশ ইস্যু। এ ক্ষেত্রেও ভালো করতে হবে। রানা প্লাজা ধসের পর নানা ধরনের কমপ্লায়েন্স পূরণে সক্ষম হয়েছে খাতটি। ফলে পরিবেশ ইস্যুতেও ভালো করার সুযোগ রয়েছে।
ফাহমিদা বলেন, যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সেগুলো হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও তৈরি পোশাক খাতকে এগিয়ে নিতে নীতিসহায়তা ও অর্থনৈতিক সহায়ক হাতিয়ারগুলো পর্যাপ্ত নয়। সবুজায়নের পথে কারখানা আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতার জন্য বিনিয়োগের অভাব রয়েছে, বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোর সেই সক্ষমতা নেই বললেই চলে। আবার দীর্ঘদিন ধরে পোশাকপণ্যের দাম না বাড়ায় খাতটির উদ্যোক্তারাও আর্থিকভাবে আশানুরূপ সফলতা পাচ্ছেন না। কিন্তু পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে দরকার বড় বিনিয়োগ। তাই গ্রিন ফ্যাক্টরি নির্মাণের আগ্রহে ভাটা পড়ছে।
অন্যান্য চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পরিবেশগত দিকগুলো নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এই পরিবর্তনের জন্য খাতসংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত তথ্য ও জ্ঞানের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এ খাতের কর্মীদের জীবনমানে পরিবর্তন, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কারখানার দূষণ কমানোসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে এ খাতে সবুজ কারখানা বাড়লে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এর সুফল পাবে।
অনুষ্ঠানে সিপিডি জানায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪১ লাখ মানুষ নিয়োজিত। বছরে এখান থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার আয় করে বাংলাদেশ, যা মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি। তাই খাতটির ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে।
পরিবেশবান্ধব কারখানা পরিচালনাকারী উদ্যোক্তারা জানান, পরিবেশবান্ধব কারখানা পরিচালনা খরচ অনেক বেশি। তার পরও বেশির ভাগ উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও ক্রেতা-বায়াররা কর্মপরিবেশের মান উন্নয়নের কথা বললেও বাড়তি দাম দিতে চান না। একই সঙ্গে সরকারের নীতিসহায়তাও সবুজ শিল্পায়নবান্ধব নয়। বেসরকারি খাতের পোশাক মালিকরা নিজ উদ্যোগে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দিয়ে পরিবেশবান্ধব কারখানা পরিচালনা করলেও লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না।
তারা আরও জানান, পোশাকের ন্যায্যমূল্য দিতে গড়িমসি করছেন অনেক ক্রেতা। তাই সরকারকে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। এ জন্য একটি তহবিলও আছে। কিন্তু নানা শর্তের কারণে উদ্যোক্তারা তহবিলটি থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন সুবিধা পাচ্ছেন না।
তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বিজিএমইএ অনেক আগে থেকেই সবুজ শিল্পায়ন নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে ১৫৭টি কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্লাটিনাম ও ৯৪টি গোল্ড সার্টিফিকেট পেয়েছে। প্রতি মাসে গ্রিন হিসেবে সার্টিফিকেট পাচ্ছে।
ডিবিএল গ্রুপের প্রধান সাসটেইনেবিলিটি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহ বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য ও সরকারের কাছ থেকে নীতিসহায়তা না পেলে পোশাক খাতে সবুজায়নের লক্ষ্য অর্জন উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, পোশাক খাতে সবুজায়নের বিষয়ে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো নীতি নেই। যে যেভাবে পারছে, করছে। এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি দরকার বলেও মতামত দেন তিনি।
