উল্টোরথে অ্যাথলেটিক্স

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৩৬ এএম

এসএ গেমসের সোনার পদক সোনার হরিণ হয়ে গেছে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের জন্য। হার্ডলার মাহফুজুর রহমান মিঠু ২০০৬ কলম্বো গেমসে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের সর্বশেষ স্বর্ণপদক এনে দিয়েছিলেন। আগামী বছর পাকিস্তানে হওয়ার কথা এসএ গেমসের ১৪তম আসর। গতকাল ১৬ জনের অ্যাথলেট তালিকা জমা দিয়েছে তারা বিওএ’র কাছে। মূল উদ্দেশ্য এদেরকে এসএ গেমসের জন্য গড়ে তোলা। এ ছাড়া এ বছর অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ, এশিয়ান ও ইসলামি সলিডারিটি গেমসেও এদের মধ্য থেকেই অনেকে প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশের। কিন্তু এই অ্যাথলেটদের গড়ে তোলার দায়িত্বটা দেওয়া হচ্ছে তিন বর্ষীয়ান কোচকে, যারা প্রত্যেকেই শীর্ষ পর্যায়ে কোচিং থেকে দূরে আছেন বহু বছর ধরে!

মীর শরীফ হাসান, সুফিয়া খাতুন ও নজরুল ইসলাম রুমি। অ্যাথলেট অঙ্গনে এরা প্রত্যেকেই সুপরিচিত। নিজেরা তারকা ছিলেন। অতীতে কোচ হিসেবেও সাফল্য পেয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোচিংয়ের সঙ্গে একদমই যোগসূত্র নেই। কোচিংয়ের আধুনিক কলাকৌশলও একই কারণে খুব জানা থাকার কথা নয়। উল্টোরথে চড়ে বসা ফেডারেশনের নির্বাচক কমিটি তাদেরকেই রেখেছে প্রথম পছন্দের তালিকায়। অথচ তাদের হাতে বিকল্প ছিল অনেক। প্রতিশ্রুতিশীল বেশ কজন কোচ অ্যাথলেটিক্স কোচিং নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। কোচিংয়ের স্বীকৃত সর্বোচ্চ সার্টিফিকেটও আছে তাদের। একজন তো চীনা সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডিও করেছেন দেশের অ্যাথলেটিক্সের উন্নয়নের অন্তরায় বিষয়ে। বিভিন্ন পর্যায়ে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতাও আছে। বর্তমানে যারা খেলছেন, তাদের অনেকেই এই তরুণ কোচদের হাতে গড়া। কিন্তু ফেডারেশন তাদের বিবেচনায়ই রাখেনি।

কারণটা জানতে চাইলে ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি। তাই আমরা সিনিয়র তিনজনকে পছন্দের তালিকার শীর্ষে রেখেছি। আশা করছি তাদের মাধ্যমে অ্যাথলেটিক্সের সোনালি অতীত ফিরে আসবে।’ নির্বাচক কমিটির প্রস্তাবনা অবশ্য এখনই নির্বাহী কমিটিতে চূড়ান্ত হয়নি। তবে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রকিব মন্টুর সঙ্গে কথা বলে মনে হলো নির্বাচক কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, ‘এ নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমাদের নির্বাচক কমিটি অনেক ভেবেচিন্তেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও সামনের এসএ গেমসে একাধিক স্বর্ণপদকের স্বপ্ন দেখছেন মন্টু, ‘বিওএ এসএ গেমসের ক্যাম্পের জন্য আমাদের কাছে ১০ জনের নাম চেয়েছে। আমরা ১৬ জনের নাম দিয়ে বলেছি এদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিতে পারলে অবশ্যই ভালো ফল আসবে। আমাদের লক্ষ্য একাধিক স্বর্ণপদক এনে দেওয়া। এ জন্য আমরা যত দ্রুত সম্ভব আর্মি স্টেডিয়ামে ক্যাম্প শুরু করতে চাই।’

১৯৮৮ সালে সর্বশেষ জাতীয় দলের কোচ ছিলেন শরীফ হাসান। এরপর পেশাগত কারণেই কোচিংয়ে সক্রিয় হননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (ক্রীড়া) হিসেবে ২০১৪ সালে অবসর নেন। সেই পঞ্চাশের দশকের এই অ্যাথলেট একটা সময় কোচিং করিয়েছেন সাইদুর রহমান ডন, মিলজার হোসেন, শাহ আলমদের মতো অ্যাথলেটদের। তবে গত তিন দশক কোচিং থেকে ছিলেন বহু দূরে। সম্প্রতি অবশ্য তাকে দেখা গেছে কোচিংয়ে ফিরতে। ফেডারেশন জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বাছাইকৃত ১৫ অ্যাথলেট নিয়ে মাসব্যাপী ক্যাম্পের আয়োজন করে। সেই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন শরীফ ও বিকেএসপির সাবেক কোচ সুফিয়া খাতুন। আধুনিক কোচিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শরীফ বলেন, ‘দেখুন এখন বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন ২-৩ সপ্তাহের কোর্স করে ভূরি ভূরি সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছে। আমাদের ছেলেরা সেই সব সার্টিফিকেটের জোরে কোচ বনে যাচ্ছে। আসলে কোচিং করানোর যতটুকু স্কিল থাকা প্রয়োজন সেটা তাদের নেই।’

সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে কোচিংয়ের ওপর ১৪ মাসের একটি ডিপ্লোমা কোর্স করেছিলেন শরীফ। এরপর বদলে গেছে অনেক নিয়মকানুন। ফিটনেস ধরে রাখতে, নিজের উন্নতি করতে ক্রীড়া বিজ্ঞানে ঝুঁকেছে গোটা বিশ্ব। শরীফ মনে করেন জাতীয় দলের দায়িত্ব পেলে এসব সম্পর্কে হাতেকলমে ধারণা খুব একটা না থাকলেও চলবে, ‘আমি কোচিং ছাড়লেও কোচিং নিয়ে লেখাপড়া বন্ধ করিনি। থিওরিটিক্যালি ভালো জানাবোঝা থাকলে প্র্যাকটিক্যালি কাজ করাটা কঠিন কিছু নয়।’ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে না হয় সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেবেন শরীফরা। কিন্তু অ্যাথলেটিক্স কোচ হওয়ার যে পূর্বশর্ত নিজেরও ভাল ফিটনেস থাকা, সেটাও এই তিনজনের কারই নেই। এরা তিনজনের বয়স সত্তর থেকে আশির কোটায়। মাঠে তাহলে হাতেকলমে শিক্ষাটা এরা কীভাবে দেবেন?

বিকেএসপির অ্যাথলেটিক্স বিভাগের ইনচার্জ মোহাম্মদ মেহেদী হাসান পিএইচডি করেছেন। ৪৬ বছরের এই কোচের ক্যারিয়ারও প্রায় কুড়ি বছরের। অথচ একটি বারও সিনিয়র জাতীয় দলের কোচ হতে পারেননি। মেহেদী অবশ্য এজন্য ভাগ্যকেই দুষছেন, ‘লেভেল-থ্রি করেছি। পিএইচডি করেছি বায়োমেকানিক ও দেশের অ্যাথলেটিক্স নিয়ে। দুটি দেশের সরকার আমাকে স্কলারশিপ দিয়েছে, অথচ দেশেই কাজ করার সুযোগ পাইনি। কেন পাইনি, সেটা ফেডারেশনই বলতে পারবে। আমি এটাকে দুর্ভাগ্য হিসেবেই দেখি।’ মেহেদী বলেন, ‘আধুনিক কোচিংয়ের পূর্বশর্ত নিজে ফিট থাকা। কারণ টেকনিক্যাল অনেক কিছুই আপনাকে ট্র্যাকে হাতেকলমে শেখাতে হয়। তাছাড়া প্রতিনিয়ত বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে নিয়মকানুন পরিবর্তন হচ্ছে। স্পোর্টস সায়েন্সের ওপর সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসব কিছুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেদেরও বদলাতে হয়।’ সর্বশেষ ২০১৯ এসএ গেমসে স্প্রিন্ট কোচ হিসেবে জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করেন লেভেল থ্রি কোর্স করা আরেক বিকেএসপির কোচ আল্লাহ আল কাফি। সাবেক দ্রুততম মানব এরপর থেকেই ব্রার্ত্য জাতীয় দলে। মাঝে অবশ্য খণ্ডকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গত বছর টোকিও অলিম্পিকের দিন দশেক আগে। অনোন্যপায় হয়েই জহির রায়হানের সঙ্গে টোকিওতে কাফিকে পাঠায় ফেডারেশন। এখন আর তিনি বিবেচনায়ই নেই। কাফি বলেন, ‘আমি জানি না কেন আমাকে রাখা হয় না। বর্তমান অ্যাথলেটদের অনেকেই সরাসরি আমার হাতে গড়া। এখন যদি ফেডারেশনের কাছে আমার প্রয়োজন না পড়ে, তাহলে তো কিছু বলার নেই।’

মেহেদী, কাফি ছাড়াও কখনই ফেডারেশনের রাডারে থাকেন না আরও অনেক কোচ। এর মধ্যে অন্যতম নোয়াখালী থেকে অনেক অ্যাথলেট তুলে আনা রফিক উল্লাহ আখতার মিলন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কোচ ইমরান হোসেনরা। যারা দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছেন পর্দার আড়ালে। আর তরুণদের বঞ্চিত করের আড়ালে থাকতে থাকতে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে মিলিয়ে যাওয়া তিনজনে ফেডারেশন পেতে চাইছে সাফল্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত