ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সেনা ফিরিয়ে নেওয়ার একদিন পর ক্রিমিয়া থেকেও সেনা ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে রাশিয়া।
বুধবার এক বিবৃতিতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় শাখা (ক্রিমিয়ায়) তাদের সামরিক মহড়া শেষ করায় ওই শাখার সব সেনাসদস্যকে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে’।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়- মহড়ায় ব্যবহৃত ট্যাংক, সামরিক যানবাহন ও গোলাবারুদ ক্রিমিয়া থেকে রেলপথে নিয়ে আসা হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের ভিডিও ফুটেজেও দেখানো হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযোগ সেতু দিয়ে রুশ সেনাদের ফিরে আসার দৃশ্য।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য ও রাশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইউক্রেন কয়েক বছর আগে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করার পর থেকেই উত্তেজনা শুরু হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। সম্প্রতি ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্যপদ না দিলেও ‘সহযোগী দেশ’ হিসেবে মনোনীত করার পর আরও বেড়েছে এই উত্তেজনা।
গত দুই মাস ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে ১ লাখেরও বেশি সেনা মোতায়েন রেখেছে রাশিয়া। পাশাপাশি, সম্প্রতি সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার অন্যতম মিত্ররাষ্ট্র বেলারুশেও। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে ক্রিমিয়ার বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ৩০ হাজার বাড়তি রুশ সেনা অবস্থান করছিলেন।
এর মধ্যে মঙ্গলবার ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সৈন্যদলকে ফিরিয়ে নিয়েছে রাশিয়া। তার একদিন পর ক্রিমিয়া থেকেও সেনা প্রত্যাহার শুরু করল দেশটি।
ইউক্রেন যেন ন্যাটোর সদস্যপদ লাভের আবেদন ফিরিয়ে নেয়, মূলত সেজন্য দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টির করতেই সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছিল রাশিয়া। কারণ, ১৯৪৯ সালে গঠিত ন্যাটোকে রাশিয়া বরাবরই পাশ্চাত্য শক্তিসমূহের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে মনে করে।
কিন্তু এই সেনা মোতায়েন ঘিরে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপক উত্তেজনা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে। এক পক্ষের সেনা মোতায়েন ও অপর পক্ষের উত্তেজনায় রীতিমতো যুদ্ধাবস্থা দেখা দেয়, যা এখনও চলছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার বলেছেন যে, তার দেশ ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্রসমূহ পুতিনের এই আশ্বাসে একেবারেই আস্থা রাখতে পারছেন না।
মঙ্গলবার এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, যে কোনো সময় ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরু হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা এখনও রয়ে গেছে।
ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস মঙ্গলবার দেশটির বেতার সংবাদমাধ্যম এলবিসি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে বলেন, ‘রাশিয়া যদিও বলেছে যে ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে আমরা চাই সীমান্ত থেকে যেন সব রুশ সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়’।
ইউক্রেন ইস্যুতে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপে কোনো যুদ্ধ চায় না মস্কো। একইসঙ্গে পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির সঙ্গে সামরিক জোট ন্যাটোর সম্পর্ক নিয়ে রাশিয়ার যে দাবি রয়েছে, সেটি এখনই পুরোপুরি সমাধান হতে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সংখ্যক সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পুতিন একথা বলেন। মস্কো সফররত জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ভ্লাদিমির পুতিন।
সংবাদ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, নিকট ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সদস্য করা হবে না বলে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে রাশিয়াকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এটি সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো নিশ্চয়তা নয়।
পুতিনের ভাষায়, ‘আমাদের এই বিষয়টি এখনই সমাধান করা উচিত... এবং আমরা আশা করি (রাশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে) আমাদের যে উদ্বেগ রয়েছে সেটিকে আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে’।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপে অবশ্যই আমরা কোনো যুদ্ধ চাই না। আর এজন্যই আমরা আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছি। ফলাফল হিসেবে রাশিয়াসহ সব দেশের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের একটি চুক্তি হতে পারে’।
ইউক্রেনের সীমান্ত এলাকা থেকে কিছু সৈন্য ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নিলেও রাশিয়ার পক্ষ থেকে উত্তেজনা প্রশমনের কোনও লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ। মঙ্গলবার ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন।
ন্যাটোর এই মহাসচিব বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়ার পক্ষ থেকে উত্তেজনা কমানোর কোনও লক্ষ্য দেখতে পাইনি। তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সম্পর্কে মস্কো থেকে আসা ‘লক্ষণ’ সতর্কভাবে আশাবাদী করছে।
ইউক্রেনের সীমান্তে তীব্র সামরিক সমাবেশের মাঝে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজায় রাশিয়ার সিদ্ধান্তে স্বাগত জানিয়েছেন ন্যাটোর প্রধান। তবে কূটনৈতিক সমাধানের এই ইঙ্গিত যাতে কাজ করে সেটি প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক শুরুর আগে মঙ্গলবার জেনস স্টলটেনবার্গ বলেছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত, মস্কো থেকে সেই ইঙ্গিত মিলছে। এটি সতর্ক আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে আমরা এখনও রাশিয়ার পক্ষ থেকে উত্তেজনা নিরসনের কোনও ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি না।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি বন্ধ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কাজ শুরু করতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্টলটেনবার্গ।
ওদিকে, গত প্রায় দুমাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাঁধানোর যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছিল, ইউক্রেন সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার পাশ্চাত্যের দেশগুলোর এই প্রচারণায় ‘পানি ঢেলে দিয়েছে’ বলে বিদ্রুপ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে মারিয়া জাকারোভা বলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাসে আজকের দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ আজ, ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসী দেখল পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার-প্রচারণা কত করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে’।
‘কোথাও একটি গুলিও চলেনি, কিন্তু ইউরোপ যে কী পরিমাণ লজ্জা পেয়েছে- তা আমরা সবাই অনুভব করতে পারছি’।
