বেশিরভাগ রান্নায় তেল অপরিহার্য উপাদান। আগে সরিষার তেল ব্যবহৃত হলেও এখন সয়াবিন বেশ জনপ্রিয়। পাশাপাশি বাজারে এসেছে আরও অনেক তেল। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর তেলের তালিকায় সরিষাই শীর্ষে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
মুখরোচক ভাজাপোড়া খাবার তেল ছাড়া হয় না। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, সবজির বড়া, পিঠা ইত্যাদি তেলেই ভাজতে হয়। অতিরিক্ত তেল দিয়ে রান্না ও তেল দিয়ে ভাজা খাবার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। খাবার তেলে ভাজলে খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়। ফলে এই খাবার সুস্বাদু হলেও শরীরের তেমন কোনো কাজে লাগে না।
সাধারণত তেল বা চর্বি দুই ধরনের উৎস থেকে পাওয়া যায়। সম্পৃক্ত তেল বা চর্বি (Saturated fats) যা প্রাণিজ উৎস থেকে পাওয়া যায়। যেমন ঘি, মাখন ইত্যাদি। আর অসম্পৃক্ত তেল বা চর্বি (Unsaturated fats) যা উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাই। যেমন- সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল, অলিভ তেল, বাদাম তেল, তিলের তেল ইত্যাদি। রান্নার কাজে দুই ধরনের উৎস থেকে পাওয়া তেল ব্যবহার করা হয়।
ট্রান্সফ্যাট
ট্রান্সফ্যাট এক ধরনের হাইড্রোজিনেটেড তেল বা ফ্যাট যা রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল বা LDL-এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই ট্রান্সফ্যাট সাধারণ তাপমাত্রায় জমাট অবস্থায় থাকে। রক্তনালির রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত করার জন্য এই ট্রান্সফ্যাট দায়ী। এটি স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অত্যধিক তেলে ভাজা খাবারে রয়েছে উচ্চমাত্রার ট্রান্সফ্যাট।
কোন তেল ভালো
অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ করলে সূর্যমুখী তেলে বেশি পরিমাণ বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়। অন্যদিকে অলিভ তেলে এই বিষাক্ত উপাদান অন্যান্য তেলের তুলনায় কম উৎপন্ন হয়। কিন্তু অলিভ তেলের Smoking point (যে তাপমাত্রায় তেলের ওপর যখন হালকা ধোঁয়া তৈরি হয়) কম হওয়ায় এই তেলে ডিপফ্রাই করা উচিত নয়। আবার সূর্যমুখী তেল, সয়াবিন তেলের Smoking point বেশি হওয়া সত্ত্বেও ডিপফ্রাইয়ে ব্যবহার করা ঠিক নয় কারণ উচ্চ তাপে এতে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়। তাই গবেষকদের মতে, উচ্চতাপে রান্নায় যেমন ভাজা, গ্রিলিং, রস্টিংয়ের জন্য অসম্পৃক্ত শোধিত কেনোলা বা সরিষার তেল, পাম তেল, নারিকেল তেল এবং ঘি উপযোগী।
স্বাস্থ্যঝুঁকি
অতিরিক্ত তেল দিয়ে ভাজা খাবার সহজে হজম হয় না। এগুলো দেহে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে দেহের ওজন বৃদ্ধি পায়। রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। রক্তনালিতে চর্বি জমাট বেঁধে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি করে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। হৃদপি-ের নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করে। এছাড়া ডায়াবেটিসসহ যকৃত, ফুসফুস এবং অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
একবারের বেশি
তেল একবার ব্যবহার করা হলে এর রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হতে থাকে। বারবার একই তেলে রান্না করলে এতে পোড়া গন্ধ তৈরি হয়। সাধারণত তিন বারের বেশি একই তেল ভাজার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রতিবার ব্যবহারের আগে তেল ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া উচিত। এছাড়া তেল গাঢ় বর্ণ ধারণ করলে এবং পোড়া গন্ধ পাওয়া গেলে সেই তেল ব্যবহার করা একেবারেই উচিত না।
স্বাস্থ্যকর উপায়
তেলকে Smoking point (তেলের ওপর যখন হালকা ধোঁয়া তৈরি হয় অর্থাৎ তেল গরম হয়) অনুযায়ী তাপ দেওয়া। সরিষার তেল, পাম তেল, নারিকেল তেলসহ উচ্চ Smoking point সমৃদ্ধ তেল ব্যবহার করা। খাবার ভাজার জন্য সঠিক পাত্র (Frying pan) ব্যবহার করা উচিত। পাত্রে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। একসঙ্গে অনেক খাবার একই রান্নার পাত্রে ভাজা উচিত নয় কারণ এতে পাত্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন হতে পারে যা পাত্রে বিদ্যমান তেলের তাপমাত্রাও পরিবর্তন করে। খাবারের অতিরিক্ত তেল দূর করার জন্য ছাঁকনি জাতীয় চামচ ব্যবহার করতে হবে এবং খাবার ভাজার পর ন্যাপকিন ব্যবহার করলে অতিরিক্ত তেল শোষিত হবে।
নানারকম তেল
খাবার তৈরিতে প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন ধরনের তেল ব্যবহার করি। বাজারে নানা ব্র্যান্ড, বিভিন্ন নামের তেল রয়েছে। কোনটা রেখে কোনটা ব্যবহার করব এ নিয়ে দোটানায় থাকি। তাই তেল কেনার সময় কিছু বিষয় লক্ষ করতে হবে। সব ধরনের তেলেই চর্বি বা ফ্যাট থাকে। ফ্যাট মানেই যে তা খারাপ, এমন নয়। তেলে সাধারণত স্যাচুরেটেড, মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যেগুলো আমাদের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রার তারতম্য ঘটায়।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়, যা আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকিতে ফেলে। যেসব তেলে এই ফ্যাটের মাত্রা বেশি সেগুলো পরিহার করা ভালো। আবার পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়, যা উপকারী। যে তেলে পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা বেশি, সেগুলোই ব্যবহার নিরাপদ। সব ধরনের তেলের বোতলের লেবেলে পুষ্টি উপাদানের তালিকা থাকে। কেনার সময় এই তালিকায় থাকা ফ্যাটের মাত্রা কত সেটা লক্ষ করুন। যে তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা বেশি সেগুলোই বাছাই করুন। মনে রাখবেন, যে তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ৩৫ শতাংশের নিচে এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ৫০ শতাংশের ওপরে সেই তেল প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য ভালো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেলের স্মোক পয়েন্ট। অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় তেল পুড়ে ফ্যাটগুলো ভেঙে ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি করে তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই রান্নার পদ্ধতির ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন অলিভ অয়েলে পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলেও এর স্মোক পয়েন্ট অনেক কম হওয়ায় ভাজাপোড়ার জন্য এই তেল ঠিক নয়। তবে সালাদ ড্রেসিং এবং অল্প আঁচের রান্নার জন্য ভালো। আমাদের দেশে যে পদ্ধতিতে খাবার রান্না করা হয় তাতে বেশি স্মোক পয়েন্ট (১৭৭ থেকে ২৩২ ডিগ্রি) সম্পন্ন তেল কেনাই উপযুক্ত।
সয়াবিন : সয়াবিন আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় তেল। এই তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ৩৫ শতাংশের নিচে এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ৫০ শতাংশের ওপরে। এর স্মোক পয়েন্টও অনেক বেশি (২৫৬ ডিগ্রি)। বেশি তাপমাত্রার রান্না, ভাজাপোড়া ইত্যাদি খাবার তৈরির জন্য সয়াবিন তেল বেশি উপযোগী। গবেষণায় দেখা গেছে, সয়াবিন তেল ডায়াবেটিস, স্থূলতা, স্নায়ুজনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সরিষা : সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে আমাদের শরীরের কোলেস্টেরলের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমে। শুধু খাওয়ার জন্যই নয় চুল ও ত্বকের যতেœও সরিষা তেল উপকারী।
সানফ্লাওয়ার : এই তেল প্রচুর পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ। এর স্মোক পয়েন্ট অনেক বেশি (২২৭ ডিগ্রি)। দৈনিক যেকোনো রান্নার জন্য উপযোগী। সানফ্লাওয়ার তেলে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ আছে, যা রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভাজাপোড়ার ক্ষেত্রে এই তেল এলডিহাইড নামের ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
রাইসব্রান : রাইসব্রান তেল মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ। এর স্মোক পয়েন্ট (২৫৪ ডিগ্রি) বেশি হওয়ায় যেকোনো খাবার রান্নায় ব্যবহার উপযোগী। এই তেল রক্তের কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ কমায়। এ ছাড়া টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগারের মাত্রাও কমাতে সাহায্য করে। যাদের ব্লাড প্রেসার কম, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এই তেল ব্যবহার করা উচিত।
জলপাই : জলপাই তেলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, স্তন ক্যানসার, হাড় মজবুত, ওজন কমানো, মন প্রফুল্ল রাখা এবং কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। শুধু খাবারেই নয়, ত্বকের যতেœও জলপাই তেল দারুণ উপকারী।
আপনি খাবারে যে তেলই ব্যবহার করুন না কেন, এর দোষ-গুণ নির্ভর করে কীভাবে এবং কোন খাবারে ব্যবহার করছেন তার ওপর। তাই তেল কেনার আগে অবশ্যই পুষ্টিমান দেখে কিনুন। একটি কথা অবশ্যই মাথায় রাখবেন, তেল যতই ভালো হোক, খাবারে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং মাত্রাতিরিক্ত ভাজাপোড়া সবার জন্যই ক্ষতিকর।
তেল ছাড়া রান্না : যেকোনো সেদ্ধ (Steamed) খাবার তেল ছাড়াই রান্না করা যায়। তেমনি রোস্টেড (ঝলসানো) করা খাবারেও তেল অতি সামান্য ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় একেবারে ব্যবহার না করলেও চলে। আবার বেকিং (সেঁকা) করতেও তেলের প্রযোজন হয় না। খাবারে তেল লাগে কিছু ভাজতে। অর্থাৎ যাকে বলে ঋৎুরহম। এবার এই ভাজা চার রকমের হয়। কোন ভাজায় কতটা তেল লাগে সেই অনুযায়ী সাজালে তা হবে ডিপ ফ্রাই, প্যান ফ্রাই, স্টির ফ্রাই এবং sauteing।
সেরা তেল : সয়াবিন তেল দিয়েই বেশি রান্না হয়। স্বাভাবিক তাপে তেমন ক্ষতি হয় না। তবে ভাজায় ব্যবহারের সময় তেলটি দীর্ঘ সময় ধরে চড়া তাপে থাকলে এর যে ‘আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড’ (অসম্পৃক্ত চর্বি) আছে তা ‘ট্র্যান্স ফ্যাটি অ্যাসিডে’ পরিণত হয়। অনেক সময় শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। রাইস ব্রান অয়েলের ‘ফ্যাটি অ্যাসিড কম্পাউন্ড’ শরীরের জন্য বেশ ভালো। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়। পাকস্থলী ও কোলন ক্যানসার এবং হৃদরোগের প্রতিষধক। তেলটি প্রস্তৃত করার সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় শোধন করা প্রয়োজন, নয়তো ক্ষতির কারণ হয়। খাঁটি পাওয়া গেলে সরিষার তেল ভালো। তবে সব তেলের সেরা জলপাই তেল। একেক তেলের একেক গুণ। তাই কোনোটিতে চিরস্থায়ী বাঁধা না পড়ে মাঝে মাঝে বদলে নিলে স্বাস্থ্যে যথার্থ উপকার হবে।
