বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নকামী কল্যাণ অর্থনীতিতে সব পক্ষকে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন এবং সব প্রয়াস প্রচেষ্টায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়ে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির আবশ্যকতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে, করোনাক্লিষ্ট স্বাস্থ্য শিক্ষা অর্থনীতি নিয়ে পর্যালোচনার প্রাক্কালে নিজের দিকে নিজে তাকানোর মতো এই অনিবার্য মুহূর্তে। বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা প্রাদুর্ভাবের কালে প্রত্যেক দেশ ও অর্থনীতিকে পরনির্ভরশীলতার পরিবর্তে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অনিবার্যতা যখন দেখা দিচ্ছে ঠিক সে সময় কিয়েভ নিয়ে ক্রেমলিনের সামরিক নাট্যমঞ্চ নতুন বিশ্ব সংকটের সন্নিকটে সবাই।
করোনা-উত্তরকালে বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায়, উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, হবে সর্বত্র। তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। চাকরিকে সোনার হরিণ বানানোর কারণে সে চাকরি পাওয়া এবং রাখার জন্য অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়-দায়িত্বহীন চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকার ফলে নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ অপচয়ের এর চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে গোষ্ঠীনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ্র সাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কীভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সেদিকেই ঝোঁক বেশি হওয়াটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচয়ে যে অঢেল অর্থব্যয় চলে তা যেন এমন এক বিনিয়োগ যা অবৈধভাবে অধিক উসুলের সুযোগ আছে বলেই। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিতচিত্ত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব নিজেরাই যখন উৎপাদনবিমুখ আর শ্রমিক স্বার্থ উদ্ধারের পরিবর্তে আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শোষণের প্রতিভূ বনে যায় তখন দেখা যায় যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচণ্ড স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে উৎপাদন, উন্নয়ন তথা শ্রমিক উন্নয়ন সবই বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
একটি ভালো সংগীত সৃষ্টিতে গীতিকার সুরকার গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত প্রয়াস যেমন পরিহার্য তেমনি দেশ বা সংসারের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সুচারুরূপে সম্পাদন সম্ভব নয়। আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার বেলাতেও এমনকি যে কোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন উদ্যোগেও ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি বলে বিবেচিত হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসকে, সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে করপোরেট কালচারের প্রেরণা হিসেবে শনাক্ত করেন, সেখানেও সমন্বয়ের আবশ্যকতা অপরিহার্য। স্থান কাল পাত্রের পর্যায় ও অবস্থান ভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করাও সামগ্রিক সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার একটা অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ।
মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতিসাধিত হয়। মানব সম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়তা হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, সহিংস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কিংবা যুদ্ধ এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহারে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পপরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যের অন্যায় অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ সৃষ্টি করতে পারলে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের আর্থসামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ অবৈধ উপলব্ধি এবং ভালোমন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে সম্পদপ্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই- চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলোআনা টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমনে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সম্পদের অবৈধ অর্জন এবং তদুপরি নির্মম প্রতিযোগিতা, নিজের ব্যাপারে ষোলো আনা জরুরি ভাবলেও অন্যের অধিকার অস্বীকার ও বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।
দেশাত্মবোধ দেশের শিল্পায়নের প্রশ্নেও বিবেচ্য। বিদেশি সামগ্রীর প্রতি আগ্রহ ও আসক্তি দেশি শিল্প পণ্যের বাজারকে সংকুচিত করে, দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বিদেশি সামগ্রীর চাহিদায় আমদানি ব্যয় বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রা ভা-ারের ওপর চাপ পড়ে, তার চাইতে বড় কথা এ চাহিদার ফলে বিদেশি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও সেখানকার কর্মসংস্থানে সহযোগিতা করা হয়। হতদরিদ্র এবং বেকারত্বের ভারে ন্যুব্জ একটি অর্থনীতির জন্য বিদেশি বিলাসদ্রব্য, ভোগ্যপণ্য আর ফলমূল গুঁড়োদুধ এসবের ওপর নির্ভরশীলতা মানে নিজেদের সার্বিক স্বার্থের সঙ্গে প্রবঞ্চনা। বেনাপোল স্থলবন্দরে কাস্টম হাউজের কার্যক্রম পরিদর্শনকালে একটি আশ্চর্য বিষয় কর্র্তৃপক্ষের নজরে আসে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও সহকারী পণ্য শুল্কায়ন ও খালাসের জন্য বেনাপোলে অপেক্ষায় অবস্থানকালে নিজেদের সঙ্গে আনা চাল-ডাল-ডিম-তেল-নুন নিজেদের স্টোভে রান্না করে খায়। তাদের যদি কোনো আইটেম ঘাটতি পড়ে, এমনকি একটা দেয়াশলাই পর্যন্ত, তারা সেটি বাংলাদেশের বাজার থেকে কিনবে না, তারা পায়ে হেঁটে ভারতীয় অংশে গিয়ে সেখানকার দোকান থেকে ওই জিনিসটি কিনে আনবে। তারা বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করবে না। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ অবশ্যই ইতিবাচক, দেশিক এবং গঠনমূলক। বন্দরে সে সময় ভারত থেকে প্রত্যাগত এক বাংলাদেশি পরিবারের লাগেজ বাংলাদেশের শুল্ক কর্মকর্তারা চেক করছিলেন তখন দেখা গেল বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করে কি না তারা এনেছেন বিদেশ থেকে ,আমসত্ত্ব, চুলের ক্লিপ, সাবান টুথপেস্ট সবই। অথচ এসব জিনিস আমাদের দেশে সহজলভ্য। এটা মানসিকতার প্রশ্ন। দেশের মানুষ দেশে উৎপাদিত সামগ্রী না কিনলে উৎপাদনে উন্নয়ন উৎকর্ষ আসবে কী করে। দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করে তুলতে দেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশের বিকল্প দেখিনি। যে জিনিস দেশে আছে অথচ হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, যে সামগ্রী দেশে উৎপাদিত হয় কিন্তু সে সবের কোয়ালিটি হয়তো ততটা উন্নত নয়, এমন কিছু সামগ্রী দেশে উৎপাদন করা সম্ভব কিন্তু হয়তো উপযুক্ত কাঁচামাল কিংবা উৎপাদন কৌশল হয়তো জানা নেই, হয়তো নেই প্রয়োজনীয় মেশিনারি কিংবা রয়েছে উৎপাদনে উপযুক্ত অবকাঠামো অপ্রতুলতা। সে সব সুযোগ, কোয়ালিটি, প্রযুক্তি, পুঁজির সমাহার ঘটিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশি শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তাতে বেকার সমস্যার সমাধান হয়, বিদেশি মুদ্রা ব্যয় কমে এবং জাতীয় আয় বাড়ে।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআর-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান
