একই গ্রামে ৪ দফা ভূমি অধিগ্রহণ

ঠাঁইটুকুও হারাতে বসেছে দেড়শর বেশি পরিবার

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২২, ১২:৪৩ এএম

সার কারখানা, রেলপথ ও সড়ক নির্মাণে তিন দশকে তিনবার ভূমি অধিগ্রহণের কবলে পড়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর দয়ালপুর মৌজার দৌলতপুর গ্রামের মানুষ। দফায় দফায় ভূমি অধিগ্রহণে মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতভিটা ছাড়াও আবাদি জমিজমা সব হারায় গ্রামটির দেড়শর বেশি পরিবার। পরিবারগুলো পরে কোনোমতে স্বল্প জায়গায় তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে নিলেও এবার সেই আশ্রয়টুকুও হারাবার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন (ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) নির্মাণের জন্য দৌলতপুর গ্রামে ফের ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এ খবর গ্রামটির বাসিন্দাদের জন্য যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে চতুর্থ দফায় ভূমি অধিগ্রহণের কবলে পড়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় গ্রামটির দেড়শর বেশি পরিবারের কয়েকশ মানুষ তাদের শেষ সম্বল রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছেন। তারা ইতিমধ্যে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন সড়ক বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সরেজমিন দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, সরিষাবাড়ীর আওয়া ইউনিয়নের দয়ালপুর মৌজার দৌলতপুর গ্রামে তারাকান্দি-ভূঞাপুর রেলপথ ও মহাসড়কের পাশে বসবাস গ্রামটির দেড় শতাধিক পরিবারের। যমুনার ভাঙনে জমিজমা হারানোর পর যমুনা সার কারখানা, তারাকান্দি-ভূঞাপুর রেলপথ নির্মাণ ও তারাকান্দি-ভূঞাপুর মহাসড়কের জন্য এ গ্রাম থেকে তিন দফা ভূমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), রেল কর্র্তৃপক্ষ ও সড়ক বিভাগ। যমুনার ভাঙন ও দফায় দফায় ভূমি অধিগ্রহণের কবলে পড়ে গ্রামের অনেক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারও এখন প্রায় নিঃস্ব। প্রায় ভূমিহীন এসব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতবাড়ি ছাড়া এখন অবশিষ্ট বলতে আর কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। এরপরও সম্প্রতি সরিষাবাড়ী-তারাকান্দি সড়ক উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে দয়ালপুর মৌজার দৌলতপুর গ্রাম ও পোগলদীঘা মৌজার পোগলদীঘায় দুটি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে জামালপুর সড়ক বিভাগ। ফলে চতুর্থ দফায় ভূমি অধিগ্রহণের কবলে পড়ে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে দৌলতপুর গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারের। শেষ সম্বল রক্ষায় বাধ্য হয়ে একাধিকবার মানববন্ধনসহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছে গ্রামটির বাসিন্দারা। একই সঙ্গে প্রকল্প অন্য কোনো সুবিধাজনক জায়গায় বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মিলন হোসেন বলেন, ‘বাপ-দাদার পাঁচ বিঘা জমি ছিল। এর মধ্যে যমুনায় ভাঙছে, যমুনা সার কারখানা করার সময় বিসিআইসি জমি নিয়েছে। তারাকান্দি-ভূঞাপুর রেলপথের জন্য রেল কর্র্তৃপক্ষ জমি নিয়েছে। সবশেষ তারাকান্দি-ভূঞাপুর মহাসড়কের জন্য সড়ক বিভাগ জমি নিয়েছে। এখন আমার মাত্র ৩ শতাংশ বাড়ির জমি আছে। এখন এ জমিটুকুও নেওয়ার জন্য সরকার প্রস্তাব করছে। আমরা প্রকল্প স্থানান্তরের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছি। মানববন্ধন করেছি। আমরা চাই প্রকল্পটি স্থানান্তর করা হোক।’

একই গ্রামের মোকাদ্দেছ আলী বলেন, ‘যমুনার ভাঙনের পর সরকারে তিনবার জমি নিছে। এখন যে জমি আছে তাতে কোনোরকমে ভাঙাচুরা ঘর তুইলা পরিবার নিয়ে আছি। এ জমি যদি সরকারে নিয়া যায় তাইলে আমগোরে মাথা গোঁজার ঠাঁইও থাকব না।’

জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবসংক্রান্ত চিঠি হাতে পাওয়ার পর থেকে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জানিয়ে গ্রামের আরেক বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘যমুনা নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে মামাশ্বশুরের বাড়িত থাকি। এহন এই জমি নেওয়ার জন্য সরকার চিঠি দিছে। চিঠি পাওয়ার পর থাইকা ঘুম, খাওয়া সব হারাম হইয়া গেছে। এই গ্রামে আমার শ্বশুর-শাশুড়ির আছে। সেই কবরের ওপর দিয়া গাড়ি-ঘোড়া যাইতে দিমু না।’

সড়ক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, জামালপুর সওজের অধীনে সরিষাবাড়ী-তারাকান্দি-ভূঞাপুর সড়ক উন্নয়নে ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পোগলদীঘা ও দৌলতপুর গ্রামে দুটি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণে ব্যয় হবে ২৯ কোটি টাকা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জামালপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের আগে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। দৌলতপুর ও পোগলদীঘা গ্রাম দুটি যমুনা সার কারখানার নিকটবর্তী ও সড়কের পাশে হওয়ায় গ্রাম দুটিতে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই গ্রাম দুটি মূলত “সুইটেবল প্লেস”। পোগলদীঘায় কোনো আপত্তি না থাকলেও দয়ালপুর মৌজার দৌলতপুর গ্রামের মানুষ আপত্তি করেছেন। তাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে নিয়ে সাইট ভিজিট করব। আশা করি সমস্যার সমাধান হবে। আমরা টেকনিক্যালি বিষয়গুলো আবারও যাচাই করে দেখব। স্থান পরিবর্তনের কোনো সুযোগ থাকলে আমরা পরিবর্তনের চেষ্টা করব।’

দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দাদের আপত্তির বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দয়ালপুর মৌজার দৌলতপুরে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের আপত্তি পাওয়ার পর শুনানি করা হয়েছে। এখানে অধিকসংখ্যক বাড়িঘর পড়বে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা সরেজমিন তদন্ত করে যত কমসংখ্যক বাড়িঘর পড়বে সে অনুযায়ী নতুন প্রস্তাব করে অধিগ্রহণ করব। সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তিনিও সেভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমরা বাড়িঘর বাদ দিয়ে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রাখব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত