বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে জয়া আহসানের ব্যক্তিগত অনুভূতি

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২২, ০৯:৪৬ পিএম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন আজ। এই দিনে পুরো জাতি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছেন বঙ্গবন্ধুকে। জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসানও তাকে স্মরণ করে লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান রত জয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে শুটিংয়ের ফাঁকে একটা দুষ্কর্ম করে ফেলেছি। অনিন্দ্য দার অনুরোধে ‘রোববার’ম্যাগাজিনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা তৈরি করেছি। বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় ব্যাপ্তির মানুষকে নিয়ে আমি কী লিখব। আমি লিখলাম ব্যক্তিগত অনুভূতি…’

জয়ার ব্যক্তিগত অনুভূতি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘কিশোরবেলায় দাদাবাড়ি যাওয়ার সময় আমাদের সে কী উত্তেজনা! সেখানে শুধু দিগন্তই উন্মুক্ত নয়, কিছুদিনের জন্য জীবনটাও। দিন কয়েকের জন্য কোনো শাসন নেই। প্রতিটা মুহূর্তই নিজের মতো করে থাকা, প্রত্যেকটা দিন কেবলই উদ্‌যাপনের, একেবারে নিজের মতো করে।

বাবা আর মায়ের সঙ্গে জড়াজড়ি করে আমরা যাচ্ছি, গোপালগঞ্জের পথে। আমাদের গ্রামের নাম রাতুইল। শহর ছেড়ে গ্রামে ঢুকতেই দৃশ্যপট কেমন মায়ায় ভরে গেছে। চারপাশ ঝাকড়া গাছপালায় সবুজ। দূরে হঠাৎ হঠাৎ অস্পষ্ট রেখা যেখানে আঁকাবাঁকা হয়ে উঠেছে, সেগুলো ঘরবাড়ি। আল মাহমুদের কবিতা ধার করে বলতে হয়, ‘মানুষের সাধ্যমতো ঘরবাড়ি’। আমরা উঁকিঝুঁকি মেরে সে দৃশ্য তৃষ্ণার্তের মতো পান করতে থাকি। এর মধ্যেই হঠাৎ বাবা বলে ওঠেন, এই দ্যাখো, আমরা টুঙ্গিপাড়ায় চলে এসেছি। ওই যে বঙ্গবন্ধুর ভিটা।

‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটা উচ্চারণ করার সময় বাবার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে যেন সামান্য বাষ্প এসে জমে। বঙ্গবন্ধু নামে মানুষটার গুরুত্ব কি আর তখন বোঝার বয়স হয়েছে! কিন্তু তার কথা বলার সময় যে বাষ্পে ধরে আসে তার গলা, সেখান থেকে কিছু একটা বুঝে নিয়েছি। এই মমতা আর দিন কয়েকের স্বাধীনতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামটা সে বয়সে কেমন মিলেমিশে গিয়েছিল।

বাবার কাছে বঙ্গবন্ধুর গল্পও কি কম শুনেছি! বাবার তিনি নায়ক। আরেকটু বড় হয়ে বুঝেছি বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার মমতার টান। বঙ্গবন্ধু তার মনে আরও অনেকের মতো স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার উদাত্ত আহ্বানে অস্ত্র হাতে বাবা ছুটে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সেই এক মানুষের ডাকে বাবার মতো কোটি কোটি মানুষ তখন নতুন একটি রাষ্ট্র জন্ম দেওয়ার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। শুধু বাবার তো নয়, জনতারই তিনি নায়ক।

আমরা বড় হয়েছি বাবার মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে। বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চোখে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সব অর্থে একটি জনযুদ্ধ। পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিপুল সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল ছাত্র আর কৃষকসহ সাধারণ মানুষেরা। তারা জীবনে অস্ত্র দেখেনি। তাদের রসদ ছিল যৎসামান্য। প্রথমে তারা শুরু করেছিল গেরিলাযুদ্ধ। এরপর সরাসরি লড়াই। ৩ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিলে তো সমন্বিত মিত্রবাহিনী প্রত্যক্ষ যুদ্ধেই নেমে পড়ল। তারই হাত ধরে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

যুদ্ধের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ করা হয়েছিল ১১টি সেক্টরে। বাবা যুদ্ধ করেছিলেন ২ নম্বর সেক্টরে, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেভাবে আসন্ন যুদ্ধের জন্য বাঙালিকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন, বাবার রক্তে তার তাপ আগেই এসে লেগেছিল। ঘর থেকে পথে নেমে গিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের আগের বছরগুলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুহুর্মুহু ফেটে পড়ছিল সারা দেশ। সেই তরুণ বয়সে বাবা তাতে যোগ দিয়েছিলেন। বেতার অফিসের সামনে তিনিও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে। নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছিলেন জনতার হাতে হাতে তৈরি হলুদ কাপড় কেটে বাংলাদেশের মানচিত্র বসানো মুক্তিযুদ্ধের লাল–সবুজ পতাকা।

পাকিস্তানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু যে সাহস আর দূরদৃষ্টির সঙ্গে পথ কেটে কেটে তিনি সারা দেশের জনতাকে নিয়ে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। সে পর্যন্ত তার জীবনের বড় অংশই কেটেছে জেলে। পাকিস্তানি শাসকদের মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তাব ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী–পুত্র–কন্যার মধুর সংসারের স্বাদ আস্বাদ করতে পারেননি। কোটি মানুষের জীবনে তার জীবন মিশে গিয়েছিল।

বাবা যখন এসব ইতিহাসের ঘটনা গল্পের মতো করে বলতেন, আমরা চোখ বড় বড় করে শুনতাম। তিনি যে আমাদের গোপালগঞ্জেরই মানুষ, ছোট আমাদের মনে এ নিয়ে আলাদা একটা গর্বও হতো। মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন। মুক্তিযোদ্ধারা যখন তার সামনে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র সমর্পণ করলেন, বাবাও সেখানে গিয়েছিলেন। নিজের হাতে অস্ত্র রেখে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সামনে। বাবার অস্ত্র সমর্পণের সেই ছবিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ছোট্ট ইতিহাসটুকু চিরকালের জন্য মিশে রইল।

জেলজীবনের কারণে পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বিচ্ছেদের কাহিনি পড়েছিলাম আরও পরে, তারই লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিতে। একবার তিনি বহু দিন জেলবন্দী থাকার পরে পরিবারের কাছে ফিরেছেন। তার বড় মেয়ে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তখন কিশোরী। অনেক কটা দিন বাবার স্নেহময় সান্নিধ্য পাননি। এত দিন পর নাগালে পেয়ে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ রাসেলের বয়স আরও কম। গুটিগুটি পায়ে তিনি এগিয়ে এলেন বড় বোনের কাছে। বড় বোনকে বললেন, হাসু আপা, তোমার বাবাকে কি আমিও বাবা বলে ডাকতে পারি?

এই নিবিড় মমতামাখা পারিবারিক ছবির মধ্যে যে অশ্রু লুকিয়ে ছিল, সে অশ্রুতে মিশে কোটি মানুষের অশ্রুর স্রোত বয়ে গিয়েছিল ১৯৭১ সালে। তার সঙ্গে আরও মিশে গিয়েছিল লাখো মানুষের রক্তের ধারা। তারই ভেতর থেকে পৃথিবীর মানচিত্রে দ্বীপের মতো জেগে উঠেছিল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপকার হয়ে উঠেছিলেন চরম ত্যাগ আর তিতিক্ষার মূল্যে।

ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরে থাকা এই বাংলাদেশেরই কিছু মানুষ তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তার স্বজনসহ। এরপর বছরের পরে বছর ধরে নানা প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলেছে তার নামে। কিন্তু যে দেশের ধমনিতে তার রক্ত বইছে, যে দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তারই স্বপ্নের ভিত্তির ওপরে, সেখানে তার নাম কি আদৌ মুছে দেওয়া সম্ভব! বাংলাদেশের জনতার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। জনতার হৃদয়ের গভীরেই তার আবাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত