পাবনার দুঃসাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। বীরকন্যা প্রীতিলতার অনুসরণে পুরুষের বেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন সরাসরি রণাঙ্গনে। হানাদার বাহিনী পাবনায় আক্রমণ করলে ২১ বছর বয়সী মিতিল এক আত্মীয়ের কাছে মাত্র ৩০ মিনিটে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো শিখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের রুখতে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়েই ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকায় তাকে নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘এ শাই গার্ল উইথ এ গান’ শিরোনামের প্রতিবেদন। এ খবর শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরে আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকেও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগঘন কণ্ঠে প্রচারিত হয় বিশেষ প্রতিবেদনটি। বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সবার জন্য এ খবর ছিল অনুপ্রেরণার। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এই দুঃসাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখার কোনো প্রচেষ্টা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার সহযোদ্ধারা।
১৯৫০ সালে ২ সেপ্টেম্বর পাবনা শহরের নানাবাড়িতে জন্ম নেন শিরিন বানু মিতিল। তার বাবা বামপন্থি রাজনীতিবিদ খন্দকার মোহাম্মদ শাহজাহান। মা সেলিনা বানু বামপন্থি রাজনীতিবিদ ও পূর্ব বাংলার আইন সভার সাবেক সদস্য। বাবা-মায়ের রাজনৈতিক আদর্শ মিতিলকে প্রভাবিত করে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়ন পাবনা শাখার সভাপতিও নির্বাচিত হন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মিতিলের দুই ফুফাতো ভাই জিন্দান ও জিঞ্জির তাদের মায়ের নির্দেশে যুদ্ধের ময়দানে রওনা হন। তখন মিতিলও ঘরে বসে থাকেননি। তাই তিনি ফুফাতো ভাইদের পোশাক পরে, শার্ট-প্যান্ট পরে ছেলে সেজে যুদ্ধে অংশ নেন।
শিরিনের সহযোদ্ধা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ২৭ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনের যুদ্ধে মিতিল পুরুষের বেশে অংশ নেন। হালকা পাতলা গড়ন, আর মাথায় ছোট চুলের কারণে তাকে মেয়ে হিসেবে চেনা যায়নি। পরদিন পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ছাত্র-জনতার তুমুল যুদ্ধ হয়, যাতে মিতিলই ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
রবিউল আরও বলেন, ৩১ মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম বসানো হয়। ৯ এপ্রিল পাবনার নগরবাড়ী ঘাটের কাছে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। সে সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয় মিতিলকে। এ ছাড়া নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে যুদ্ধ করেন মিতিল। পরে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ তীব্র হলে বামপন্থি নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশার সাথে মিতিল কুষ্টিয়া হয়ে ভারতে চলে যান। পথে, ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাদের। কিছুদিন পর ভারতের দ্যা স্টেটসম্যান পত্রিকায় মিতিলের ছবিসহ প্রতিবেদন ছাপা হলে বিশ^ব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন সারা বিশে^ মিতিলের নাম ছড়িয়ে পড়লেও এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা তার নাম। এরপর ভারতে বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ঘুরে মেয়েদের নিয়ে দল গঠন করেন মিতিল। স্বাধীনতার পর মিতিল ‘প্রিপ ট্রাস্ট’ নামের এনজিওর পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ তিনি ঢাকায় মারা যান।
রণাঙ্গনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়। স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নেই তার নিজ জেলা এমনকি রাজনৈতিক বিচরণ ক্ষেত্র এডওয়ার্ড কলেজেও। এ নিয়ে হতাশ ক্ষুব্ধ তার সহযোদ্ধারাও।
তার সহযোদ্ধা সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা সুলতান আহমেদ বুড়ো বলেন, দেশ স্বাধীনের পর এই অসামান্য মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। জীবিত থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থগিত করে রাখা হয়েছিল তার নাম। এখন তো আর কেউ স্মরণও করে না। অথচ তার বীরত্বগাথা পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, পাবনায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামে প্রতিষ্ঠান, স্মৃতিকেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু শিরিন বানু মিতিলের স্মৃতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লিখিত ইতিহাসেও তার অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। নতুন প্রজন্মের কাছে তার স্মৃতি ধরে রাখতে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে তার নামে হল ও স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানাই।
