পুতিন কি রাশিয়ার ক্ষমতা থেকে উৎখাত হতে পারেন?

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ০২:০৪ পিএম

শান্তি আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের সমাপ্তির সম্ভাবনা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে আক্রমণের পর থেকেই রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ছে, যার ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

পশ্চিমা বিশ্ব সহ মার্কিন মিত্রদের শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞার ফলে পুতিন প্রশাসনের ভেতরেও দ্বিমত বাড়ছে। তবে পুতিন সেই ভিন্নমতকে চূর্ণ করতে বদ্ধপরিকর।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন করছেন, ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান কি নড়বড়ে হয়ে উঠছে?

পুতিন তার আইন প্রণেতাদের ওপর শক্ত কর্তৃত্ব উপভোগ করেন। যেমনটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও স্বঘোষিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিককে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় ভোটাভুটিতেও প্রমাণিত হয়েছে।

রুশ সংসদ দুমার ৪৫০ জন সদস্যের মধ্যে ৩৫১ জনই পুতিনের অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই পদক্ষেপকে সমর্থন দেন।

তবে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপিরও অভিযোগ উঠেছে। যার মাধ্যমে তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন।

যাইহোক, কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন যে, রাশিয়ার ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞাগুলো দেশটির অর্থনীতিতে কঠোর আঘাতের পাশপাশি পুতিনের অবস্থানকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।

কিন্তু ইউক্রেনীয় সমাজবিজ্ঞানী ভোলোদিমির ইশচেঙ্কো, যিনি সোভিয়েত-পরবর্তী অঙ্গনে বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি এ ব্যাপারে একমত নন।

তিন বলেন, ‘আমি মনে করি না যে বিপ্লব নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য ফলাফল’। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, শুধু যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দূর্দশাই রাশিয়ায় পুতিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

পুতিনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে রাশিয়ার ‘অভিজাতদের মধ্যে বিভক্তি, বিরোধীদের মধ্যে ঐক্য, সমন্বয় ও সংহতি’ প্রয়োজন হবে।

২০ শতকের গোড়ার দিকে রাশিয়ান সাম্রাজ্যে অজনপ্রিয় যুদ্ধের ফলে দুটি গণবিপ্লব হয়েছে। একটি ১৯০৫ সালে ১৯০৪-০৫ এর রুশো-জাপানিজ যুদ্ধে অপমানজনক পরাজয়ের পরে এবং আরেকটি ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যেটি বিশ্ব ইতিহাসে রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লব নামে খ্যাত।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অন্যান্য সদ্য-স্বাধীন প্রজাতন্ত্রগুলোতে ধারাবাহিকভাবে গণ অভ্যুত্থান ঘটতে থাকে। জর্জিয়া, আর্মেনিয়া এবং মোলদোভাতে রুশপন্থী সরকারগুলো উৎখাত হয় এসব গণ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। কিরগিজস্তানে তিনটি এবং ইউক্রেনে আরও তিনটি বিপ্লব হয়েছিল।

পুতিন গত দুই দশকের একটি বড় অংশ নিজেকে তথাকথিত ‘রঙীন বিপ্লবের’ বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে কাটিয়েছেন, যেমন ইউক্রেনে ২০০৪ সালের অরেঞ্জ বা কমলা বিপ্লব। এই বিপ্লবকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন থেকে পরিকল্পিত বিল্পব বলে মনে করেন।

পুতিন তার বিরোধী ব্যক্তিত্বদেরকে কোণঠাসা করে তুলেছেন। যেমন বর্তমানে কারাগারে বন্দী আলেক্সি নাভালনি। যাদের রাজনৈতিক আন্দোলন বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিক্ষোভ সংগঠিত করতে সহায়তা করছেন।

ইশচেঙ্কো বলেন, ‘বিরোধীদের জন্য পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নাভালনির আন্দোলন দমন করা হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধ নিয়েও বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিরোধী দলগুলো। কমিউনিস্ট এবং অন্যান্য অনেক দল যারা বিরোধীদের সঙ্গে মিত্রতা করতে পারত, তারা এখন পুতিনের যুদ্ধকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে’।

ইশচেঙ্কো আল জাজিরাকে বলেন যে, বেশিরভাগ যুদ্ধবিরোধী রাশিয়ান নাগরিকের দেশত্যাগ করায় পুতিনের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ এখন আরও অসম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে ২ লাখেরও বেশি যুদ্ধবিরোধী রাশিয়ান নাগরিক দেশত্যাগ করেছেন বলে অনুমান করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে গণবিদ্রোহ উস্কে দেওয়ার জন্য নির্বাসিতদেরকে স্বদেশের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রাখতে হবে। কিন্তু তাও সম্ভব নয়। কারণ রাশিয়ায় ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াও ব্লক করে রাখা হয়েছে।

‘বিপ্লবের চেয়ে এখন প্রাসাদ অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা বেশি। যদিও আমি নিশ্চিত নই যে, ইউক্রেনে চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে পুতিনের বিরুদ্ধে অভিজাতরা ষড়যন্ত্র করবে কিনা’।

‘সুতরাং, শেষ পর্যন্ত, ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ই রাশিয়ায় অভ্যুত্থান না বিপ্লব হবে তা এবং পুতিনের শাসন উৎখাত বা টিকে থাকার বিষয়টি নির্ধারণ করবে। অন্য কোনো উপায় নেই’।

গণঅভ্যুত্থান না হলে, সম্ভবত পুতিনের অভ্যন্তরীণ সার্কেলের অলিগার্ক এবং কর্মকর্তারা, যারা নিষেধাজ্ঞায় হতাশ এবং যুদ্ধের কারণে ফ্রান্সের দক্ষিণে তাদের প্রমোদতরীতে বিলাসি জীবন উপভোগ করতে পারছেন না, সেই অভিজাতরা তাকে অপসারণের চেষ্টা করতে পারেন।

 

‘সবাই জানে পুতিন বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে কী করেন’

১ মার্চ রাশিয়ার একজন স্বাধীন সাংবাদিক ফরিদা রুস্তমোভা বলেন যে, পুতিনের ঘনিষ্ঠ রাশিয়ান অভিজাতদের মধ্যেকার সূত্রগুলো তাকে বলেছে যে, তারা যুদ্ধের শুরুতে অন্য সবার মতোই হতবাক হয়েছিলেন। একজন তো পরিস্থিতিকে ‘ক্লাস্টারফাক’ বলে বর্ণনা করেন।

সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, পুতিন গত দুই বছরে বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছেন। তিনি নিজেকে একটি বাঙ্কারে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন এবং শুধুমাত্র তার ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎ করেছেন।

কিন্তু প্রাথমিক ধাক্কার পরে, রাশিয়ান অভিজাতরা নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিচ্ছেন, রুস্তমোভা আল জাজিরাকে বলেন। যিনি বিবিসি রাশিয়ান সার্ভিস এবং স্বাধীন আউটলেট টিভি রেইন এবং মেডুজার জন্য কাজ করেছেন।

রুস্তমোভা বলেন, ‘অনেকেই এখন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। রাশিয়ায় এখন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে কিছুই করা যাবে না এবং এই পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনওভাবে বেঁচে থাকতে হবে। তারা পুতিনকে ছেড়ে চলে যেতে পারবেন না। কারণ কেউ যদি পদত্যাগ করে বা যুদ্ধের সময় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তাকে একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সবাই জানে পুতিন বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে কী করেন’।

ক্ষমতায় আসার পর পুতিন দ্রুত রাশিয়ার অভিজাতদের (অলিগার্কদের) লাগাম টেনে ধরেন, যারা ১৯৯০-র দশকে রাশিয়ার ব্যবসা, মিডিয়া এবং রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি দেশের শীর্ষ ধনীদের একটি বৈঠকে ডেকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার জন্য বলে দেন।

যারা তার আদেশ মেনে চলেনি, যেমন মিখাইল খোডোরকভস্কি এবং বরিস বেরেজভস্কি, তাদের হয় কারারুদ্ধ করা হয়েছিল বা রাশিয়া ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। যারা ১৯৯০-র দশকে ধনী হয়েছেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থিতাবস্থা গ্রহণ করেছেন, ক্রেমলিনের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ খুবই কম।

রুস্তমোভা বলেন, ‘রাশিয়ান অভিজাতদের উদারবাদী অংশের দিক থেকে যুদ্ধ-বিরোধী একটা অবস্থানের আশা করা যেত। কিন্তু পুতিন বছরের পর বছর ধরে তাদেরও পুরোপুরি দূর্বল করে দিয়েছেন এবং তাদের শক্তভাবে আটকে রেখেছেন। ফলে তাদের দিক থেকেও কোনো বিদ্রোহের সম্ভাবনা নেই’।

সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা পুতিন অভিজাতদের বদলে নিজেকে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দিয়ে ঘিরে রেখেছেন এবং প্রধান পদে শুধু তার অনুগতদের বসিয়েছেন। যেমন, ভিক্টর জোলোটভ, যিনি ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। কিন্তু পুতিন এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন, যাতে এই তথাকথিত সিলোভিকি বা ‘বাহিনীর লোকদের’ কেউই খুব বেশি শক্তিশালী না হয়। ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) এবং মিলিটারি ডিরেক্টরেট (জিআরইউ) গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালনা করে। আর ফেডারেল প্রটেকশন সার্ভিস পুতিনের দেহরক্ষায় নিয়োজিত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনী বিশেষজ্ঞ পাভেল লুজিনের মতে, ‘পুতিন এক ধরনের বিশেষ সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক সম্প্রদায় তৈরি করেছেন, যেটিতে পুতিনের চারপাশে কিছু জেনারেল এবং অন্যান্য উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন এবং তারা রাশিয়ান সাম্রাজ্যের পুনরুদ্ধারে বিশ্বাস করেন। এটি তাদের জন্য এক ধরণের ধর্ম’।

‘এর পরে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত এবং সাবেক আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা, যারা রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্তিগত কর্পোরেশনের মধ্যে মধ্য-স্তরের ব্যবসায় নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তারা আজ প্রায় সবকিছু হারাচ্ছেন। আরও রয়েছে হতাশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা, যারা আগ্রাসন সম্পর্কে খুশি না, কারণ তারা এর ভয়াবহ পরিণতি বুঝতে পেরেছিলেন; এবং এরপরে রয়েছে পুলিশ, যাদের খুব বেশি প্রভাব নেই’।

পাভেল লুজিন বলেন যে, ক্রেমলিন সেনাবাহিনী এবং পুলিশকে ‘ভয়’ পায় এবং একটিকেও বিশ্বাস করে না।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে পুতিনের ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা দেখি না। তবে সমস্যা আরও বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি বদলেও যেতে পারে’।

যুদ্ধে পরাজয় ঘটলে পুতিনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাও সেই পরাজয়ের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন এবং পুতিনকে সরিয়ে দিতে পারেন।

অসমর্থিত সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে, এফএসবি-র কর্নেল জেনারেল সের্গেই বেসেদাকে সম্ভবত গৃহবন্দী করা হয়েছে। কারণ তিনি পুতিনকে বলেছিলেন যে, ইউক্রেনের যুদ্ধে দ্রুত জয় হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগুকে নিয়েও জল্পনা চলছে, যাকে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তবে গুজব ছড়িয়ে পড়ার সাঙ্গে সঙ্গে পুতিন সহ কর্মকর্তাদের একটি ভিডিও মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করিয়ে বৃহস্পতিবার তাকে আবার রাষ্ট্রীয় মিডিয়াতে দেখানো হয়েছে।

কিন্তু জনগণের বিদ্রোহ, ব্যবসায়ীদের বিদ্রোহ বা সামরিক অভ্যুত্থান ছাড়াও লুজিন একটি চতুর্থ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার সামাজিক ও আর্থিক সমস্যা বাড়তে থাকলে স্থানীয় সরকার এবং আমলারা বিদ্রোহ করতে পারেন। যারা আগে খুব একটা মনোযোগ পাননি। পুতিন তার কথিত বাঙ্কারে বসে থাকা অবস্থায় বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তারা বিদ্রোহ করতে পারেন।

‘সংক্ষেপে বলতে গেলে, পুতিন নিজেকে দৈনন্দিন শাসন ব্যাবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। যার ফলে রুশ আমলাতন্ত্র পুতিনকে উপেক্ষা করেই কাজ শুরু করতে পারে। যদি এমনটা হয় তাহলে এমনকি কোনো অভ্যুত্থান ছাড়াই রাশিয়ার ক্ষমতায় পরিবর্ত ঘটে যাবে। এবং পুতিন ক্ষমতা হারাবেন’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত