মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকার প্রতিহত এবং অনন্ত বিজয় দাশের লেখনীকে চিরতরে স্তব্ধ করতে সন্ত্রাসী কায়দায় প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ নূরুল আমীন বিপ্লব।
বুধবার সিলেটের বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা মামলায় চার আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিজ্ঞানলেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা মামলায় বুধবার সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ নূরুল আমীন বিপ্লব চার আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ এবং একজনকে খালাসের আদেশ দিয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন আবুল খায়ের রশীদ আহমেদ, আবুল হোসেন ওরফে আবুল হুসাইন, হারুনুর রশীদ ও ফয়সল আহমদ।
মামলার অপর আসামি শফিউর রহমান ফারাবী ওরফে ফারাবী শফিউরকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন আদালত। আসামিদের মধ্যে আবুল খায়ের ছাড়া তিন আসামি পলাতক আছেন।
বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, 'হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও বীভৎসতা দ্বারা যে সব লেখক মুক্তবুদ্ধি, প্রগতিশীলতা, বিজ্ঞান, সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার বিষয়ে লেখেন বা বক্তব্য রাখেন তাদের মধ্যে ভীতি, শঙ্কা ছড়িয়ে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য ছিল।'
বিচারক উল্লেখ করেন, জনমনে ভীতির সঞ্চার করে এবং জননিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে ভিকটিমকে হত্যা করে এই আসামিরা গর্হিত অপরাধ করেছেন, যা বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে অনুজ্জ্বল করেছে। এই আসামিরা দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আদালতের কোনো অনুকম্পা পেতে হকদার নয়। বরং এই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা না দিলে অন্যান্য সন্ত্রাসী জঙ্গি উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজন এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত হবেন।
অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার পর এ হত্যার দায় স্বীকার করে টুইট করে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। তবে আসামিরা এ সংগঠনের বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ সত্তার সমর্থক তা সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়নি বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করে।
গত ১৪ মার্চ বিচারিক আদালত এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য বুধবার তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন।
২০১৫ সালের ১২ মে সিলেট নগরের সুবিদবাজারে নূরানী আবাসিক এলাকার নিজ বাসার সামনে খুন হন ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। পেশায় ব্যাংকার অনন্ত বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি 'যুক্তি' নামে বিজ্ঞানবিষয়ক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
সে রাতে সিলেটের বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন অনন্ত বিজয় দাশের ভাই রত্নেশ্বর দাশ।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে থানা পুলিশের কাছে থাকলেও পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়।
এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা আরমান আলী ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর আদালতে একটি অভিযোগপত্র জমা দিলে আদালত তা পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে ২০১৭ সালের ৯ মে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিলে আদালত তা গ্রহণ করেন।
ওই অভিযোগপত্রে অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যায় শফিউর রহমান ফারাবী, মান্নান ইয়াহইয়া ওরফে মান্নান রাহী, আবুল খায়ের রশীদ আহমেদ, আবুল হোসেন ওরফে আবুল হুসাইন, হারুনুর রশীদ এবং ফয়সল আহমেদকে অভিযুক্ত করা হয়।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন মান্নান। ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যু হয়। বাকি ৩ আসামি এখনো পলাতক।
প্রথম দিকে এ মামলার বিচারকাজ চলে সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে। পরে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর ২০২০ সালের শুরুর দিকে মামলাটি সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
