বিল গেটসের সঙ্গে রহস্যময় ছবিতে ইমরান-সেনাবাহিনী দ্বন্দ্বের আভাস

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২২, ০১:০৭ পিএম

গত মাসে যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মার্কিন ধনকুবের বিল গেটসের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের একটি ছবি প্রকাশ করেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা অদ্ভুত কিছু একটা লক্ষ্য করেন। গোল টেবিলে ১৩টি আসন ছিল, কিন্তু মাত্র ১২ জন মানুষকে দেখা যাচ্ছে। আরেকটি আসন খালি দেখা যাচ্ছে। আসনটি ইমরান খানের বাম পাশেই ছিল।

খালি আসনটিতে ভূতের মতো অদৃশ্য একজন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি তার চারপাশের অন্যদের সঙ্গে কথোপকথন করছেন বলে মনে হচ্ছে। ছবিটিতে কোনো কারসাজি করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে জানানো হয় যে, ছবিটিতে পাকিস্তানের নতুন গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আঞ্জুমও ছিলেন। কিন্তু তাকে ছবি থেকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে।

এই নাটকের সূচনা হয়েছিল চার মাস আগে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া আঞ্জুমকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানকারী ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই-এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে। ইমরান খান তখন ওই নিয়োগে বিলম্বিত করেন এবং জেনারেল ফয়েজ হামিদের পক্ষে সমর্থন জানান। কিন্তু ফয়েজ হামিদকে ইমরান খানের মিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা অচলাবস্থার পর অবশ্য সেনাপ্রধানেরই জয় হয়।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর সংঘাতের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রায় অর্ধেক সময় শাসন করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। ইমরান খান ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর দুর্নীতি ও পক্ষপাতমুক্ত একটি ‘নতুন পাকিস্তান’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেনাবাহিনীর খুব ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য সমালোচিত হয়েছেন।

যদিও পাকিস্তানের আইনে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীই সেনাবাহিনীর সুপারিশে আইএসআই প্রধান নিয়োগ করবেন তথাপি বিরোধীরা খানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ অভিযোগ করেন, ফয়েজ হামিদ ২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। নির্বাচনে কারসাজি করেছিলেন।

ফয়েজ হামিদকে আইএসআই-এর প্রধান হিসেবে রাখতে চাওয়া ছাড়াও ইমরান খান এক জনসভায় সেনাপ্রধানের সঙ্গে একান্ত আলোচনার কথা উল্লেখ করে সেনাবাহিনীকে বিব্রত করেছেন। কারণ সেনাবাহিনী সাধারণত প্রকাশ্যে দাবি করে থাকে যে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন প্রধান শায়েস্তা তাবাসসুম বলেন, ‘রাজনৈতিক ফোরামে প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর নাম নেওয়া ইমারন সরকারের করা সবচেয়ে বড় ভুল’। তিনি বলেন, খান এবং তার মন্ত্রীরা ‘সেনাবাহিনী আমাদের পিছনে রয়েছে’ বা ‘আমরা সেনাপ্রধানের সমর্থন উপভোগ করি’ এসব কথা বলে সেনাবাহিনীকে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে টেনে নিয়ে এসেছেন’।

গেটসের সঙ্গে গত মাসের মধ্যাহ্নভোজের পটভূমি হিসাবে কাজ করেছিল এসব ঘটনা। পোলিও নির্মূলের প্রচারণার জন্য পাকিস্তানে এসেছিলেন বিল গেটস। আঞ্জুম মিডিয়াকে তার কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যে কারণে বিল গেটসের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের ছবিতে তাকে অদৃশ্য রাখা হয়।

এই ছবি থেকেই পর্দার আড়ালে ইমরান খানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, ৬৯ বছর বয়সী প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এশিয়ার দ্বিতীয় দ্রুততম মুদ্রাস্ফীতি পাকিস্তানের ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে ইমরানের ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনাকে বিপন্ন করে তুলেছে। বিরোধীরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি আস্থা ভোটে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চলেছে।

এমনকি ইমরান খান যদি তার পদে বহালও থাকেন, শীর্ষ জেনারেলদের সঙ্গে তার বিরোধের ফলে পাকিস্তানে মাসের পর মাস ধরে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। যার মধ্য দিয়ে এটাও নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে যে, বিশ্বের পঞ্চম-জনসংখ্যার দেশটি চীন এবং রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকে যাবে নাকি ফের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দিকে ঝুঁকবে।

গেটসের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের ছবিটিই প্রমাণ যে, ইমরান খানের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখন ‘নিরপেক্ষ’ আচরণ করছে। সেনাবাহিনী পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইমরান খানের প্রতি তাদের আর সমর্থন নেই। অথচ এই গত বছরও সেনাবাহিনীর নিরব সমর্থনই ইমরান খানকে একই ধরনের চ্যালেঞ্জ থেকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল। সে সময়ও ইমরানকে ফের সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত