ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আশপাশের এলাকা থেকে রাশিয়ার সেনা প্রত্যাহার করার পর পার্শ্ববর্তী বুচা শহরে প্রচুর মরদেহ পাওয়া গিয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুচা শহরে রুশ সৈন্যরা গণহত্যা চালিয়েছে বলে রবিবার অভিযোগ করেছে ইউক্রেন। মরদেহের ছবি দেখে পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে ঠিক তখনই এমন অভিযোগ তুলল ইউক্রেন।
অবশ্য রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে, বুচার এসব ছবি ও ভিডিও মূলত ইউক্রেন সরকারের আরেকটি উস্কানি।
বুচা শহরের মেয়র বলেছেন, চেচেন যোদ্ধারা এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করার সময় রাশিয়ান বাহিনীর হাতে তিন শ জন বাসিন্দা নিহত হয়েছেন।
তবে, বুচায় বেসামরিক লোকদের হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে রাশিয়া। মস্কো বলেছে, সেখানকার কোনো বাসিন্দাই রাশিয়ান বাহিনীর সহিংসতার শিকার হয়নি। উল্টো এ বিষয়ে কিয়েভকে দোষারোপ করে রাশিয়া বলছে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে উসকানিমূলক সংবাদ ছড়াচ্ছে ইউক্রেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কিয়েভের কাছে বুচা নামের ঐ শহরে পৌঁছে গিয়েছিল রুশ বাহিনী। সেখানে রাশিয়ার একটি ট্যাংক ও সাঁজোয়া বহর ইউক্রেনীয় বাহিনীর অ্যামবুশে পড়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ হামলায় রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা থমকে যায়। পাঁচ সপ্তাহ তুমুল লড়াইয়ের পর ওই এলাকা থেকে সরে যায় রুশ বাহিনী।
রুশ সৈন্যদের শেষ দলটি গত শুক্রবার বুচা থেকে সরে যাওয়ার পর বিবিসির সাংবাদিকদের একটি দল সেখানে যায়। তারা বুচার রাস্তায় আগুনে পোড়া ও গলে যাওয়া দীর্ঘ সামরিক বহর দেখতে পান।
কিয়েভের পথে রুশ সামরিক বহরটি বুচার দিকে অগ্রসর হওয়ার পরই কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়। শহরটিতে ঢোকার রাস্তাটি ছিল সোজা ও সরু - অ্যামুবশ করার জন্য যা ছিল উপযুক্ত।
রুশ বহরের ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনী তুরস্ক থেকে আনা বেরাকতার অ্যাটাক ড্রোন দিয়ে হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
তারা রুশ বহরের সামনের এবং পেছনের যানগুলোকে ধ্বংস করে তারা বহরটিকে দু'দিক থেকে আটকে দিয়েছিল।
বুচার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ বাহিনীর হামলায় রুশ বহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, অনেককে আটকও করা হয়।
রুশ বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পাওয়া তরুণ সেনারা এসব হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তাদেরকে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে তুলে না দেয়ার অনুরোধ জানায়।
আঙ্কেল রিশা নামে এক বৃদ্ধ বিবিসিকে বলেন, তাদের জন্য আমার বেশ কষ্ট হয়েছিল। এত কম বয়সী ছিল তারা, - ১৮ থেকে ২০ - তাদের সামনে পড়ে আছে পুরো জীবন।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর সৈন্যরা যখন শহরটিতে প্রবেশ করে তখন সেখানকার সড়কে অন্তত ২০ জনের মৃতদেহ পড়ে ছিল। অনেক মরদেহের হাত ছিল পেছন দিকে বাঁধা। শহরটির মেয়র জানান, তারা ২৮০ জনের লাশ জড়ো করে গণকবর দিয়েছেন।
রুশ বাহিনী আসার পরও যে অল্প কিছু বেসামরিক মানুষ শহরটিতে ছিলেন তারা রুশ সৈন্যদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। ক্রুশ্চেভ আমলের তৈরি ফ্ল্যাটের বাইরে বসে তারা কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতেন। কারণ তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেয়া হয়েছিল।
স্বেচ্ছাসেবকরা এখন পশ্চিম ইউক্রেনের লাভিভ ও অন্যান্য জায়গা থেকে খাবারসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসছে। ৩৮ দিনে এই প্রথম রুটি খাচ্ছি আমরা, বলেন মারিয়া নামের এক নারী।
এদিকে, মস্কোর সরকার বলেছে, মধ্য ইউক্রেইনে তাদের বাহিনীর যে লক্ষ্য ছিল, তা ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। আসলে কিয়েভ দখলের কোনো পরিকল্পনাই তাদের ছিল না।
এক টুইটে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেন, বুচায় ইচ্ছকৃতভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও তার দেশে রাশিয়া গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
