রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

সড়কে প্রতিদিন নিহত ১৯, প্রাণহানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০৯:২১ পিএম

সারা দেশে গত মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৫৮টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হয়েছে ১৭৬টি। এতে মোট নিহত হয়েছে ৫৮৯ জন এবং আহত ৬৪৭ জন। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৯ জন নিহত হয়েছে।

এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৬ দশমিক ৭৫ জন। এই হিসাবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ১৩ শতাংশ ৪৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৪৬৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ৭৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মাসিক প্রতিবেদনে ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, সারা দেশে গত মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৫৮টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হয়েছে ১৭৬টি। এতে মোট নিহত হয়েছে ৫৮৯ জন এবং আহত ৬৪৭ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২২১ জন, যা মোট নিহতের ৩৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৬২ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এমনকি যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৭৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এই সময়ে ৫টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত। ১১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছে।

দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন ২২১ জন, যা মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫২শতাংশ, বাস যাত্রী ৩৯ জন, যা মোট মৃত্যুর ৬ দশমিক ৬২শতাংশ, ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি আরোহী ৩৪ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫ দশমিক ৭৭শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার যাত্রী ১৭ জন, যা মোট মৃত্যুর ২দশমিক ৮৮ শতাংশ, থ্রি-হুইলার আরোহী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-টেম্পো-জিপ-পাওয়ারটিলার) ৮১ জন, যা মোট মৃত্যুর ১৩ দশমিক ৭৫শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-চান্দেরগাড়ি-মাহিন্দ্র-টমটম) ২৪ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-বাইসাইকেল আরোহী ১১ জন, যা মোট  মৃত্যুর ১ দশমিক ৮৬শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কে ১৬৭টি যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ; আঞ্চলিক সড়কে ১৭৯টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ; গ্রামীণ সড়কে ৬৮টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ; শহরের সড়কে ৩৯টি যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানে ৫টিসড়ক দুর্ঘটনায় সংঘটিত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, গত মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৫৮ টি। এর মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৭১টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ; নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ১৬৮টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া ১৫৯টি, যা মোট মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৭১শতাংশ, যানবাহনের পেছনে আঘাত করেছে ৪৬টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ঘটেছে ১৪টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা: দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৮৩১ টি। যার মধ্যে ট্রাক ১৭৭টি, বাস ১১৪টি, কাভার্ডভ্যান ২৩টি, পিকআপ ৩৯টি, ট্রলি ১৫টি, লরি ৭টি, ট্রাক্টর ১২টি, মিকচার মেশিন গাড়ি ২টি, ড্রামট্রাক ৮টি, মাইক্রোবাস ১১টি, প্রাইভেটকার ১৭টি, মোটরসাইকেল ১৮৩টি, থ্রি-হুইলার ১৩৪টি (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-লেগুনা-হিউম্যানহলার-জীপ-পাওয়ার টিলার), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৬৬ টি (নসিমন-ভটভটি-পাখিভ্যান-চান্দেরগাড়ি-ম্যাজিকগাড়ি-মাহিন্দ্র-টমটম) এবং অন্যান্য ২৩টি।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ: সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৫দশমিক ২৪শতাংশ, সকালে ৩৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, দুপুরে ১৯ শতাংশ, বিকেলে ১৮ দশমিক ১২শতাংশ, সন্ধ্যায় ৬ দশমিক ৫৫শতাংশ এবং রাতে ১৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে: দুর্ঘটনার বিভাগ ওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, প্রাণহানি ২৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১১ দশমিক ৩৫শতাংশ, প্রাণহানি ১১ দশমিক ২০ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি ২১ দশমিক ৭৩ শতাংশ, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩ দশমিক ৯৭শতাংশ, প্রাণহানি ১৫ দশমিক ৯৫শতাংশ, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৮ দশমিক ৯৫শতাংশ, প্রাণহানি ৭ দশমিক ৩০শতাংশ, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৬৭শতাংশ, প্রাণহানি ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৮ দশমিক ২৯শতাংশ, প্রাণহানি ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৬ দশমিক ৭৬শতাংশ, প্রাণহানি ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ ঘটেছে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি, ১১৭ টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪১ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে, ২৬ টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে, ৩৩ টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত। সবচেয়ে কম নারায়ণগঞ্জ জেলায়। ২ টি দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। রাজধানী ঢাকায় ১৯ টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬ জন।

নিহতদের পেশাগত পরিচয়: গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৩ জন, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক ১১ জন, চিকিৎসক ৪ জন, স্বাস্থ্যকর্মী ৩ জন, সাংবাদিক ৪ জন, প্রকৌশলী ৩ জন, বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী ৬ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৩ জন, ডিসিসি’র পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জন, কারারক্ষী ১ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৩৬ জন, পোশাক শ্রমিক ৯ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৪ জন, ইটভাটা ও বালু শ্রমিক ৫ জন, রং মিস্ত্রি ২ জন, রাজমিস্ত্রি ৩ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ২ জন, ইউপি চেয়ারম্যান ২ জন, ইউপি সদস্য ৩ জন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৪ জন এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ট্রাকসহ পণ্যবাহী দ্রুতগতির যানবাহন ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। পথচারীরা যেমন সড়কে নিয়ম মেনে চলে না, তেমনি যানবাহনগুলোও বেপরোয়া গতিতে চলে। ফলে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই আতঙ্কজনক প্রেক্ষাপটে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে মূলত সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে। এই অবস্থার উন্নয়নে টেকসই সড়ক পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত