শুটকী নদী প্রাইভেট কোম্পানির নামে নামজারি, আদেশ স্থগিত

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২২, ০৭:৪১ পিএম

বানিয়াচঙ্গ উপজেলা ঐতিহ্যবাহী শুটকী নদী অস্তিত্বহীন ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের নামে নামজারি পুনর্বহালের আদেশ স্থগিত করেছেন জেলা জজ আদালত।

এর আগে ১৪ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ মিথিলা ইসলাম শুটকী নদীর ২৪২ একর ২০ শতক ভূমি ওই ইন্ডাস্ট্রির নামে নামজারি করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। অন্যথা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান ৬ কর্মকর্তাকে ৩ মাসের দেওয়ানি কয়েদে (সিভিল জেল) আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক দেশ রূপান্তর’ পত্রিকায় অস্তিত্বহীন কারখানার নামে শুটকী নদী নামজারির আদেশ সংবাদ প্রকাশ হলে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। প্রশাসনও নড়েচড়ে উঠে। গত ২১ মার্চ জেলা প্রশাসনের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে একটি রিভিশন মামলা দায়ের করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের আদেশের কার্যকারিতা স্থগিতাদেশের আবেদন করেন।

বৃহস্পতিবার আবেদন শুনানি শেষে জেলা জজ মোহাম্মদ হাসানুল ইসলাম আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন। সরকারি কৌঁসুলি আফিল উদ্দিন স্থগিতাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।   

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে প্রকাশ, ১৯৭২ সালে সিলেট সাবজজ আদালতে ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে দেওয়ান ইয়াহিয়া রাজা একটি সত্ত্ব মামলা ( স্বত্ব ৯৫/ ১৯৭২) দায়ের করেন। মামলায় তিনি শুটকী নদীকে বিল দেখিয়ে নদীর ভূমি তার ইন্ডাস্ট্রির নামে ঘোষণা, দখল এবং ভোগ দখল করার দাবি করেন। একই সঙ্গে তার শান্তিপূর্ণ ভোগ দখলে যাতে সরকার পক্ষ বাধা না দেয় এ মর্মে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করেন।

১৯৭৩ সালে ৩০ মে সিলেট সাবজজ আদালত বাদীর পক্ষে আদেশ দেন। একই বছর সরকার ওই আদেশের বিরুদ্ধে মিস কেস দায়ের করেন। ওই বছরে ৩১ ডিসেম্বর সরকার পক্ষের করা মিস কেস খারিজ হয়ে যায়। এরপর ১৯৭৪ সালে বাদীপক্ষ সিলেট সাবজজ-১ আদালতে ‘রেকর্ড অব রাইট’ দাবিতে একটি বিবিধ মামলা (১৫২/৭৪) দায়ের করেন। আদালত ওই বছরের ২৪ এপ্রিল বাদীর পক্ষে নামজারি করার আদেশ দেয়। ওই আদেশ বলে বাদী পক্ষ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সিলেট বরাবরে একটি নামজারি মোকদ্দমা (নং ১৪৯/৭৯-৮০) দায়ের করে। সিলেট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বানিয়াচঙ্গ উপজেলা এসিল্যান্ডকে নামজারি করার আদেশ দেন। ওই আদেশের প্রেক্ষিতে বাদীর পক্ষে নামজারি (নং ১/৮৩-৮৪) করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি হবিগঞ্জের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ সাহার দৃষ্টিগোচর হলে ১৯৯২ সালের ১০ মার্চ ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক দেওয়ান ইয়াহিয়া রাজাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকার পক্ষে একটি রিভিউ মামলা (৩/৯৫-৯৬)করা হয়। উক্ত মামলায় ইয়াহিয়া রাজার নামজারি আদেশ বাতিল করে রেকর্ড সরকারের নামে পুনর্বহাল করা হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে ৯৬ সালে (নং ১/১৯৯৬) ইয়াহিয়া রাজা হবিগঞ্জ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্বত্ব জারি মামলা দায়ের করেন।

এ ব্যাপারে সরকারি কৌঁসুলি মো. আফিল উদ্দিন জানান, স্বত্ব ৯৫/১৯৭২ইং মামলায় একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে সিলেট জেলা জজ আদালতে স্বত্ব আপিল ১৯/২০২২ দায়ের করা হয়েছে। যা শুনানির অপেক্ষায় আছে। এসএ ও আরএস জরিপে নদী শ্রেণি হিসেবে ১ নং খতিয়ানে রেকর্ড আছে। এবং সরকারের দখলে রয়েছে। অসত্য তথ্য পরিবেশন করে দাগ খতিয়ান না দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে একতরফা রায় ও ডিগ্রি হাসিল করা হয়েছে।

বানিয়াচঙ্গ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে সুঠকি নদীর ধারা বয়ে গেছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। শান্ত এই নদী ভরা বর্ষায় পানিতে টই-টম্বুর থাকে। প্রবাহিত এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ কিলোমিটার। নদীটি প্রতাবপুরে রত্না নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ৪৬ বছর ধরে বানিয়াচঙ্গের ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাঃ লিঃ কোম্পানির নামে ভোগ দখল করা হচ্ছে। বিভিন্নজনকে তারা ইজারা দিয়ে বছরে লাখ লাখ টাকা ফায়দা লুটছে।

বানিয়াচঙ্গের রাজবাড়ির ইতিহাস মোগল আমলের। ওই সময়ে সেখানে সাম্রাজ্য গড়েছিলেন রাজা গোবিন্দ সিংহ। পরবর্তীতে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে নাম রাখেন হাবিব খাঁ। তার উত্তরসূরি দেওয়ান আলী রাজার বংশধারা এখন রাজবাড়িতে বসবাস করেন। তাদের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রি নামে। তারা শুটকী নদীর মালিকানা দাবি করছেন। কোম্পানিটির বর্তমান মহাব্যবস্থাপক হচ্ছেন আহমেদ জুলকার নাঈম। তিনি ইয়াহিয়া ফিশ ইন্ডাস্ট্রিকে একটি কোম্পানি দাবি করলেও বাস্তবে সাইনবোর্ড ছাড়া কোনো কার্যক্রম বা যন্ত্রপাতি কিছুই নেই। 

জুলকার নাঈনের দাবি, শুটকী নদী নয়, এটা দেওয়ান ইয়াহিয়া রাজার পূর্ব-পুরুষেরা বোরো ফসলের জন্য ওয়াটার রিজার্ভার হিসেবে গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এর যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত