নুসরাত হত্যার তিন বছর আজ

অপপ্রচারে আতঙ্কিত পরিবার

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২২, ০৬:০০ এএম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পরীক্ষাকেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ রবিবার। অগ্নিদগ্ধ হওয়ার চার দিন পর ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিম্ন আদালতে অপরাধীদের ফাঁসির রায় হলেও তা আপিল শুনানির জন্য আটকে আছে উচ্চ আদালতে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারের আশায় প্রহর গুনছে নুসরাতের পরিবার। এদিকে দণ্ডিতদের ফাঁসির রায় এখনো কার্যকর না হলেও তাদের স্বজনরা নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পার হতে চললেও এখনো ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে অপপ্রচার করছে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আত্মীয়-স্বজনরা। যার কারণে আমরা সবসময় সামাজিকভাবে মর্যাদাহানির ভয়ে থাকি। এ ব্যাপারে আমরা আইসিটি আইনে মামলা করেছি, যা পিবিআইতে তদন্তাধীন রয়েছে।’

মৃত্যুর পরদিন ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল বিকেলে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সোনাগাজী মোহাম্মদ ছাবের সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে নুসরাতকে দাফন করা হয়। তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল শনিবার বিকেলে বাড়ির পাশের হামিদিয়া জামে মসজিদে মিলাদ ও ইফতারের আয়োজন করা হয়। সেখানে নুসরাতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয় বলে জানান বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। আজ রবিবার নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইফতার করবেন পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এছাড়া উত্তর চর ছান্দিয়া গ্রামে নুসরাতের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনী কার্যালয়ের সদস্যরা।

নুসরাত হত্যার তিন বছর পার হতে চললেও তার স্মৃতিরক্ষায় কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন মা শিরিন আক্তার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনটি বছর পার হলেও আজো নুসরাতের স্মৃতিরক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিজের জীবন দিয়ে সে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেও পায়নি সরকারি-বেসরকারি কোনো সম্মাননা।’

আফসোস করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর এই দিনে (মৃত্যুবার্ষিকী) পুলিশ ও সাংবাদিকরা এসে খোঁজখবর নেন, তারপর আর কোনো খবর থাকে না। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে নানারকম প্রতিশ্রুতি দিলেও আজো তার বাস্তবায়ন হয়নি।’ নুসরাতের স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে একটি সড়ক, স্কুল বা মাদ্রাসার নামকরণের দাবি জানান তিনি।

এখনো প্রতিদিনই মেয়েকে খুঁজে ফেরেন জানিয়ে শিরিন আক্তার বলেন, ‘আজো প্রতিদিন ভোরে তাকে খুঁজি। মনে হয় এই বুঝি নুসরাত এসে জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাকছে। ওর স্মৃতি আজো ঘরের, বাড়ির সব কিছুতেই রয়েছে। ওর পড়ার বই, জামা-কাপড় ও পছন্দের সবকিছুই গুছিয়ে রাখা হয়েছে ঘরের মধ্যে। আজ তিন বছর হলো আমি আমার মেয়ের কণ্ঠে মা ডাকটি শুনতে পাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাতে ঘুম হয় না, কারণ আমার মেয়েকে হাত-পা বেঁধে যখন তারা আগুন লাগিয়েছিল, তখন আমার মেয়ে কী করেছিল তা ভেবে শিউরে উঠি। সেদিন আমি খবর পেয়ে ফেনী সদর হাসপাতালে ছুটে যাই। তখন পুলিশ সদস্যরা আমাকে মেয়ের কাছে ভিড়তে দেইনি। তার পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করে ফেলে ডাক্তাররা। পুলিশরা আমাকে বলে, ওর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে গেছে, বাঁচে কিনা সন্দেহ। আপনি মেয়ের আগুনে পোড়া এই শরীর দেখলে সহ্য করতে পারবেন না। ডাক্তাররা আপনাকে দূরে থাকতে বলেছে। তখন আমার মেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল।’

নুসরাত হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে শিরিন আক্তার বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাসে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা মনকে বুঝ দিতে পারবে, করোনাভাইরাসে তারা মারা যাচ্ছে। কিন্তু আমার মেয়েকে জানোয়ারেরা হাত-পা বেঁধে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ৯৯ ভাগ মানুষ আমার মেয়ের পাশে ছিল, আমাদের পরিবারের পাশে ছিল। আসামি ও তাদের স্বজনরাসহ ১ পার্সেন্ট মানুষ আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে থাকতে পারে।’

আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায়বিচার পেয়েছি। শুনেছি উচ্চ আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল করছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে রায় দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

নুসরাত হত্যা মামলার রায় কার্যকরের বিষয়ে জানতে চাইলে বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে তা অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়। আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ মামলাটি শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বেঞ্চ করোনা পরিস্থিতিতে বাতিল হয়ে গেছে। এরপর আর বেঞ্চ গঠন হয়নি। তাই মামলাটির শুনানি হচ্ছে না।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। এ হত্যাকাণ্ড সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পরে একই বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ মামলার রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত