কিশোরগঞ্জের ইটনা হাওরে কৃষকের পাকা ধানের জমি তলিয়ে যাওয়ার পর জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার বড় হাওরে আগাম জাতের ব্রি-২৮ ধানে ব্যাপক চিটা দেখা দিয়েছে। ধানের জমিতে দুই-তৃতীয়াংশ চিটা দেখে মাথায় হাত পড়েছে বোরো চাষিদের। কৃষি বিভাগ বলছে, প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান চিটা হয়ে গেছে। চাষিদের ধানের জাত নির্বাচন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ না নেওয়া ও রোপণের ভুলের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তাদের দাবি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অষ্টগ্রামে এবার বোরোর আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধানের জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধানে কমবেশি চিটা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো জমির ধান নেক ব্লাস্ট রোগে সংক্রমিত হয়েছে। ব্যাপকভাবে ফসল হারিয়েছেন এমন অধিকাংশ কৃষকের ধান রোপণের সময় সংক্রান্ত জটিলতা আছে। আবার যেসব জমিতে চিটা নেই, তার সব কটির পেছনের গল্প সময়মতো রোপণ ও সঠিক পরিচর্যা। প্রতি হেক্টর জমির ব্রি-২৮ ধানের স্বাভাবিক ফলন ছয় থেকে সাত টন। ধারণা করা হচ্ছে, চিটার কারণে অন্তত পাঁচ হাজার টন ফসল কম হতে পারে।
কৃষি বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ব্রি-২৮ আগাম জাতের ধান। অন্য জাতের ধান চাষে ১৫০ দিন লাগলেও ব্রি-২৮ ধান ১৩৫ দিনেই কাটা যায়। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী জমির কৃষকরা এ ধান চাষ করেন। উজানের ঢল বা নদীর পানি বেড়ে গেলে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। সে কারণে আগে রোপণ করে ফলন আগে ঘরে তোলার জন্য ব্রি-২৮ আদর্শ। তবে এ ধান স্পর্শকাতরও। বীজতলা থেকে শুরু করে রোপণ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সময় ধরে ধরে সম্পন্ন করতে হয়। ব্যতিক্রম হলে ফলন কমে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এবার নভেম্বরের শুরু থেকে হাওরের পানি দ্রুত শুকাতে শুরু করে। সম্ভাব্য সেচ দুর্ভোগ কমাতে অনেক কৃষক আগাম বীজতলা ও রোপণ দুই-ই করে ফেলেন। যেসব কৃষক আগেভাগে ধান রোপণ করেছেন, তাদের জমিতে চিটা হয়েছে বেশি। হাওরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। এবার দিনের তাপমাত্রা ঠিক থাকলেও রাতে কমে যেত। কখনো কখনো কুয়াশা পড়ত। এ ধরনের আবহাওয়ায় ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয়। অষ্টগ্রাম কৃষি বিভাগ জানায়, উপজেলার আট ইউপির মধ্যে কাস্তুল ও দেওঘর ইউনিয়নে চিটার হার সবচেয়ে বেশি। দেওঘর ইউনিয়নে এবার ৮৮২ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধান চাষ করা হয় ২২৫ হেক্টর জমিতে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরের ফসল ফলানো মূলত ‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’ এরকম। কৃষকরা যদি সময়ের আগে ধান রোপণ করে তাহলে চিটা হয়ে যায়, আবার পরে রোপণ করলে পানিতে তলিয়ে যায়। এক্ষেতে কৃষকদের সঠিক সময় ও জাত নির্ধারণ করা একান্ত জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধানের থোড় বের হওয়ার সময় যদি রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির কম হয় তাহলে ধান চিটা হয়ে যায়। আবার ধানের শীষ সম্পন্ন হওয়ার সময় যদি অতিরিক্ত তাপমাত্রা অর্থাৎ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় তাহলে ওই সময়ের সব ধান চিটা হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ধানের চারার বয়স ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে রোপণ করতে হবে। অষ্টগ্রামের অনেক কৃষক কৃষি কার্যালয়ের এসব পরামর্শ শোনেননি।’
