‘আবদুল মুহিতের মতো গুণীজনের শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না’

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৫৯ পিএম

সাবেক অর্থমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন সিলেটের অভিভাবক। দলমতের ঊর্ধ্বে সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। নিজের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, অতল মেধা তাকে অনেক উঁচুতে রাখলেও সেই উচ্চতাকে দূরে ঠেলে তিনি সাধারণের সঙ্গে মিশতেন খুবই সাদাসিধেভাবে। তাই সাদা মনের মানুষ হিসেবেও তার পরিচিতি অনেক দিনের। সততা আর বিনয় তাকে মহান করেছে।

সেই বিনয়ী অভিভাবককে হারিয়ে কাঁদছে সিলেট। অভিভাবক হারানোর বেদনায় কাতর সিলেটের মানুষ। আবুল মাল আবদুল মুহিত সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ সিলেটে এসেছিলেন। অসুস্থতা আর বয়সের ভার তার শরীরকে অনেকটা নেতিয়ে দিলেও সিলেটে এসে তিনি যেন মানসিকভাবে আরও চাঙা হয়ে উঠেছিলেন। পরদিন ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সিলেটে গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা দেওয়া হয়।

ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনকে নিয়ে গর্বিত। অনেকে হয়তো একে আত্মগরিমা বলবেন। কিন্তু এটা অন্যায় নয়। বরং এর জন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়......।’

সেই অনুষ্ঠানে নিজের জীবন নিয়ে গর্বের কথা জানিয়েছিলেন মুহিত। বলেছিলেন, তার জীবন ‘মহাতৃপ্তি আর মহাপ্রাপ্তির’। সেই তৃপ্তি আর প্রাপ্তির হিসেব চুকিয়ে সব কাজ শেষ করে তিনি চলে গেছেন অনন্ত জীবনে। ১৭ মার্চ সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার আগে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী-স্বজনদের বলে গিয়েছিলেন, অচিরেই আবার সিলেটে আসব।

মাস দেড়েকের মধ্যেই তিনি শনিবার রাতে আবার সিলেটে ফিরেছেন, তবে প্রাণহীন নিথর দেহে। তার লাশ নগরের ধোপা দিঘির পাড়ের নিজ বাড়ি হাফিজ কমপ্লেক্সে এসে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। তৈরি হয় এক শোকাবহ পরিবেশের।         

আবুল মাল আবদুল মুহিত রবিবার সিলেটে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। সিলেট নগরীর রায়নগর এলাকায় ডেপুটি বাড়ি হিসেবে পরিচিত মুহিতের পৈতৃক বাড়ি সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।

মা  সৈয়দা শাহারা বানু চৌধুরী ও বাবা আবদুল হাফিজের কবরের পাশে দাফন করা হবে তাকে।

এর আগে রবিবার দুপুর ১২টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার লাশ নেওয়া হবে সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর ২টায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।  

এদিকে আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে সিলেট আওয়ামী লীগ দুদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালোব্যাজ ধারণ ও ঈদের পরদিন মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ এই কর্মসূচি নিশ্চিত করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবুল মাল আবদুল মুহিতকে হারিয়ে কেবল আওয়ামী লীগ নয়, সিলেটের পুরো রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া। সবাই তার জন্য কাঁদছে। আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো গুণীজনের শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না’।

সিলেটের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বংশ পরিচয়, মেধা-যোগ্যতা, কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অনেক উঁচুতে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু তিনি ছিলেন বিনয়ী। তার বিনয় থেকে সবার অনেক কিছু শেখার আছে।’   

সিলেটের প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম শীর্ষ নেতা লোকমান আহমদ বলেন, ‘আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। আলোকিত সিলেট গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা। তার চেতনাকে লালন ও সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারলে সত্যিই সমাজ আলোকিত হবে’।

সিলেটের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক রজতকান্তি গুপ্ত বলেন, ‘মুহিত সাহেব ছিলেন সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ মানুষ। শত ব্যস্ততার মধ্যেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি সময় দিতেন, আমাদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা করতেন। তার শূন্যতা অপূরণীয়’।  

৮৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পেরিয়ে শনিবার রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী, সিলেট-১ আসনের সাবেক সাংসদ আবুল মাল আবদুল মুহিত। আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫২ সালের ভাষাসংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় আবুল মাল আবদুল মুহিতের। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তান দূতাবাসে যোগ দেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জুন মাসে ইস্তফা দেন পাকিস্তানের চাকরি থেকে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদ (আইএফএডি)-এ কাজ শুরু করেন। ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে এরশাদ সরকারের আমলে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ওই সময়ে দেশের দুটি বাজেট দেন তিনি। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে।

মুহিত সর্বপ্রথম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন ২০০১ সালে। সেবার সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির প্রার্থী, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী সাইফুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের প্রার্থী হয়ে সাইফুর রহমানকে হারিয়ে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মুহিত। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। ওই দফায়ও তাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট পেশ করেছেন; যা বাংলাদেশে কোনো অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে একটি রেকর্ড। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সঙ্গে একটি রেকর্ডে নাম আছে মুহিতের। দেশে সর্বোচ্চ ১২বার বাজেট প্রদানের রেকর্ড সাইফুর ও মুহিতের। প্রায় ষাট বছরের কর্মময় জীবন ছিল মুহিতের। লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ইংরেজিতে ১২টিসহ তিনি ৩৫টি বই লিখেছেন। এমন গুণীজন আর কবে সিলেটে জন্ম নেবে, সে কথা ভেবে সিলেটবাসী এখন মুহিতের জন্য শোকাহত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত